প্রথম ও দ্বিতীয়বার করোনাঝুঁকি এড়াতে দরকার বাড়তি সতর্কতা

…………………………….. আনোয়ার হোসেন ………………………

একবার কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়বার কেউ আক্রান্ত হবেন না, এমন নয়। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে মানতে হবে কিছু নিয়ম, তৈরি করতে হবে করোনার বিরুদ্ধে ‘লং ইমিউনিটি’। দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, জাপান ও চীনে এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যারা একবার কোভিড থেকে সেরে ওঠে আবারও আক্রান্ত হয়েছেন। সংখ্যায় অনেক কম হলেও বাংলাদেশে এমন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। কভিডের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা স্থায়ী সে বিষয়ে গবেষণা চলছে। তবে একবার কভিড হলে ধরে নিতে হবে তিনি সারা জীবনের জন্য নিরাপদ নন। এ জন্য সতর্ক থাকতে হবে সব সময়।
যারা আক্রান্ত হয়েছেন এবং যারা আক্রান্ত হননি সবার জন্য একই নিয়ম। শরীরের ব্যাপারে শুদ্ধ শিষ্টাচার মানতে হবে। নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দেহকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে। মানুষের শরীরে সহজাত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা রয়েছে, যা বাইরে থেকে দেহে প্রবেশ করা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুকে ধ্বংস করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে। আবার নির্দিষ্ট ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে, যাকে বলে ‘অ্যান্টিবডি’। অ্যান্টিবডি ভাইরাসের চারপাশে প্রোটিন বন্ধনী তৈরি করে। ফলে ভাইরাস কোষে ঢুকতে পারে না। অন্যদিকে ‘টি-সেল’ উৎপন্ন করে, যা আক্রান্ত কোষ মেরে ফেলে। একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে তখন করোনার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। শরীরে ইমিউনিটি থাকে বলেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু এই অ্যান্টিবডি কত দিন থাকে তা এখনও নিশ্চত নই।
১৫ থেকে চার মাস পর আবার কোভিডে আক্রান্ত হতে পারে। করোনাভাইরাস ফুসফুসে আক্রমণ করে এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। ফলে ফুসফুস বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়বার কভিড আক্রান্ত হলে এই ফুসফুস মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নিজেকে চাঙ্গা রাখতে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত বেশ কিছু ধরনের ব্যায়াম করা দরকার। ব্যায়ামের মাধ্যমে দেহের ক্লান্তি ঝরে যায় এবং কর্মস্পৃহা ও উদ্যম বাড়ে। ফলে সহজে রোগব্যাধি আক্রমণ করতে পারে না। কিছু ব্যায়াম মস্তিস্ক সজাগ করে, মানসিক চাপ কমায়, ভালো ঘুম আনে। আর এসব শরীরের জন্য ভালো তথা রোগ প্রতিরোধের জন্য উপকারী। উপুড় হয়ে শুয়ে ব্যায়াম করার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা তথা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে, শ্বাসকষ্ট রোধ হয়। ফুসফুস থেকে রক্তে অক্সিজেন বিনিময়ে সহায়তা করে। এতে সংক্রমণের প্রবণতা অনেকটা কমে যায়। প্রথমে নাক দিয়ে ধীরে ধীরে (১০ সেকেন্ড ধরে) প্রশ্বাস নিন। এরপর একই সময় পর্যন্ত ধরে রাখুন। ঠিক একইভাবে আবার ১০ সেকেন্ড ধরে নিঃশ্বাস ছাড়ুন। আবার ১০ সেকেন্ড অপেক্ষা করে আগের নিয়মে প্রশ্বাস নিন। এই ব্যায়াম প্রতিদিন ১০ মিনিট করা ভালো। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মেরুদ- সোজা করে বসুন। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনুন। এভাবে প্রতিদিন কয়েক মিনিট ব্যায়াম করতে পারলে উপকার অনিবার্য। মুখ বন্ধ করে নাক দিয়ে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখুন। তবে প্রশ্বাস ও নিঃশ্বাস উভয় ক্ষেত্রে কিছু সময় থাকতে হবে। ব্যায়ামটি শেষে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। বুকে বালিশ দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখুন। এরপর ছেড়ে দিন। এই পদ্ধতির নাম প্রন পজিশনিং। এই ব্যায়াম দিনে দুইবার করা যেতে পারে। তবে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে করা যাবে। সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন অন্যান্য ব্যায়ামসহ ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করা সকলের জন্যই উপকার। সম্ভব হলে সামাজিক দূরত্ব মেনে পার্কে গিয়ে জগিংও করা যেতে পারে। অন্যথায় বাসার ছাদেও হাঁটা যেতে পারে।
কোভিড থেকে একবার সেরে উঠলেও ফলোআপ চিকিৎসা করাতে হবে ছয় মাস বা তারও বেশি সময়। পরবর্তী জটিলতা এড়াতে, বিশেষ করে যারা কিডনি, লিভার, হার্ট, ডায়াবেটিসের জটিলতায় ভুগছেন তারা নিয়মিত চেকআপ করাতে ভুললেই সর্বনাশ। কিছু বেসিক টেস্ট, যেমন ব্লাড কাউন্ট, লিভার ফাংশন, কিডনি ফাংশন, বুকের এক্স-রে ইত্যাদি পরীক্ষা করান। দুই মাস পরপর ইসিজি ও ইকো কার্ডিওগ্রাম করে হার্টের অবস্থা জানুন। মনে রাখবেন, অন্য রোগব্যাধি না থাকলে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের ঝুঁকি কমে। করোনাকালে যাদের ফুসফুস একবার আক্রান্ত হয়েছে তাদের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যান করে চিকিৎসকের নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে ফুসফুসের সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন। কিডনি রোগে আক্রান্তরা পানি, আমিষ ও পটাসিয়ামযুক্ত খাবার গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকুন। ডায়ালিসিসের রোগীরা নিয়মিত ডায়ালিসিস নিন। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে জিংক ট্যাবলেট, ভিটামিন ‘ডি’ সাপ্লিমেন্টারি খেতে পারেন। একবার আক্রান্তরা অন্য যেকোনো শারীরিক জটিলতায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যখন ভ্যাকসিন মিলবে তখন সেটা নেয়ার চেষ্টা করুন। একবার কভিড আক্রান্ত হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পরও বেশ কিছুদিন শারীরিক দুর্বলতা থাকে। এই দুর্বলতা কাটাতে অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে উচ্চমানের আমিষজাতীয় খাবার বেশি খেতে পারেন। বেশি বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খান। ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’, ‘ই’, বিটা ক্যারোটিন, লাইকোপেন ইত্যাদি সমৃদ্ধ খাবার খান। সবজির মধ্যে করলা, টমেটো, আলু, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, মটরশুঁটি, ফলের মধ্যে কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আনার, জলপাই, আনারস ইত্যাদি বেশি খাবেন। গ্রিন টি, লাল চা, আদা চা বেশ উপকারী।
বাইরের বা খোলামেলা খাওয়াদাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। বাইরের লোক কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া ঠিক হবে না। অনলাইনে বাজার করতে হলে মাস্ক পরে নিরাপদ দূরত্বে থেকে জিনিস সংগ্রহ করুন। বাইরের জিনিসপত্র ভালো করে পরিষ্কার করে ঘরে ঢোকান। বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাপড়চোপড় ধুয়ে ফেলুন। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে তারপর বেডরুমে গমন করুন। শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ সতর্কতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপার জন্য বাসায় সব সময় একটা অক্সিমিটার রাখুন। কারো জ্বর, সর্দি-কাশি, হাঁচি হলে অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপুন। যেখানেই থাকুন ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোবেন। সম্ভব হলে সব সময় সঙ্গে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখুন এবং মাঝেমধ্যে হাত স্যানিটাইজ করুন। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে বা কারো বাসায় গেলে প্রথমেই ভালোভাবে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন অথবা স্যানিটাইজ করুন। কোনো কাজ শেষেও স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিন। গুরুত্ব দিয়ে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। ঘরের বাইরে মাস্ক বা ফেস শিল্ড ব্যবহার করুন। এতে অবহেলা করা ঠিক নয়। মনে রাখবেন করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মাস্ক এর গুরুত্ব অপরিসীম। মাস্কে যখন-তখন হাত দেয়া যাবে না। একবার ব্যবহার করা টিস্যু, মাস্ক যেখানে-সেখানে ফেলা ঠিক নয়। যখন-তখন যেকোনো জিনিসের ওপর হাত দিয়ে ধরা যাবে না। ধরলেও ধুয়ে ফেলতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর গোসল করে নিন। প্রত্যেকেই তিন থেকে ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করে চলুন। জরুরি কাজ না থাকলে বাইরে না যাওয়াই ভালো। জীবনের তাগিদে বাইরে গেলে সতর্কতার সঙ্গে যাতায়াত করুন। গণপরিবহনে ভিড় এড়িয়ে চলুন। বেশি লোকসমাগম হয় এমন স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যকেও সুস্থ থাকতে সহায়তা করুন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More