মুহাম্মদ (সা.) এক জীবন্ত আদর্শকোষ

…………………. প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী …………………….
বাইরে তপ্তলু-হাওয়া, আর ভিতরে মানবতার চরম বিপর্যয়; গোত্রে-গোত্রে হানাহানি, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বংশ পরাম্পরায় যুদ্ধ, নিজের কন্যাসন্তানকে নিজ হাতে জীবন্ত কবর দেয়ার মতো বর্বরতা, এমন এক অন্ধকার যুগে শতবাধা-বিভক্ত আরব সমাজকে সত্যের পথ দেখাতে পাপপঙ্কিল এ ধরায় আগমন ঘটে বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর। তিনি কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য এক অনুপম আদর্শ। যেখানে অগণিত শব্দ থাকে তাকে বলে শব্দকোষ। বিপুল তথ্যের সমাহারকে বলে তথ্যকোষ। সেই হিসেবে মহানবী (সা.) কে বলাযায়’ বিশ্ব আদর্শকোষ’। কারণ তার ভিতরে ছিল সকল কল্যাণ ও মানবীয় আদর্শের পূর্ণাঙ্গ সমাহার। মানুষ তার প্রকৃত আদর্শ ও চরিত্রের বর্ণনা দিতে সবসময় হবে ব্যর্থ, কলম হবে নিস্তব্দ। কারণ, বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা স্বয়ংমহান রব্বুল আলামীন তার প্রশংসায় বলেছেন, নিশ্চয় আপনি মহানচরিত্রের অধিকারী (সূরা কলম:৪)।
কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর সাথে আচরণ:
ছেলে-সন্তান অপেক্ষাকন্যা-সন্তানকেতিনি বেশি স্নেহ করতেন এবং গুরুত্ব দিতেন। অথচ তৎকালীন আরব সমাজে মেয়ে সন্তানকে নিজ পিতা জীবন্ত কবর দিতো। যে সন্তানের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি দু’টি কন্যাসন্তানকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আগমন করবে যে আমি আর সে এ দুটির অনুরূপ হবো। এ কথা বলে তিনি তার আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন (মুসলিম:২৬৩১, তিরমিজী:১৯১৪)। পারিবারিক কলহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আজকাল একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ স্ত্রীর প্রতি স্বামীদের খারাপ আচরণ। স্ত্রীর প্রতি সুন্দর আখলাক দেখানোর ব্যাপারে হুজুর (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণ সর্বাপেক্ষা উত্তম ঈমানের দিক দিয়ে সে ব্যক্তিই পরিপূর্ণ মুমিন। তোমাদের মধ্যে তারাই সর্বাপেক্ষা উত্তম যারা তার স্ত্রীর কাছে উত্তম (তিরমিজী:১১৬; আহমাদ:৭৩৫৪)। একজন নবী হয়েও রসুল (সা.) তার স্ত্রীদের সাথে সময় দিতেন। তাদের সাথে অত্যন্ত সদয় আচরণ করতেন, একত্রে আহার করতেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, আমি গোশতের যেখানে কামড় দিয়ে খেতাম সেখান থেকেও মহানবী (সা.) খেতেন। এটা মহব্বত ও শ্রদ্ধার বিরল নমুনা। আর একবার হুজুর (সা.) আয়েশা (রা.)-এর সাথে হাঁটছিলেন। এমন সময় হুজুর (সা.) বললেন, আসো আমরা দৌঁড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতা হলো এবং নবীজি (সা.) এতে হেরে গেলেন। এর অনেক পরে যখন আয়েশা (রাঃ)-এর শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেলো, তখন তিনি আবার তার সাথে দৌঁড় প্রতিযোগিতা করলেন। এবার আয়েশা (রা.) হেরে গেলেন। নবীজি (সা.) বললেন, এটা আগের হারের প্রতিশোধ। শুধু এটাই নয়। ঘরের কাজেও তিনি স্ত্রীদের সাহায্য করতেন। তার স্ত্রীরা যখন রুটি বানাতেন তখন আটার খামির বানাতে তিনি তাদেরকে সাহায্য করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি সাধারণ গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। আর যখন নামাজের সময় হয়ে যেতো, তখন উঠে নামাজে চলে যেতেন (বুখারী: ৫৬১৩)। সমাজের বিজ্ঞ শ্রেণি, একটু চিন্তা করুন, স্ত্রীদের প্রতি মহানবী কেমন সদয় ছিলেন।
নিঃস্ব, অসহায়, এতিমও বিধবার প্রতি দয়া :
নিঃস্ব, অসহায় ও এতিমদের প্রতি দয়ার শেষ ছিলনা মহানবী (সা.)-এর। কিভাবে গরিব মানুষের মুখে হাঁসি ফোটানো যায় এই জন্য সর্বদা ব্যতি ব্যস্ত থাকতেন। তিনি তাদেরকে খুব ভালোবাসতেন এবং সাহাবাদেরকেও ভালোবাসা ও দয়ার হাত প্রসারিত করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে বলতেন, যদি কোন ব্যক্তি কোন বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ বস্ত্র পরিধান করাবেন। যদি কেউ কোন ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়ায় আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যদি কেউ কোন পিপাসিতকে পানি পান করায় মহান আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের মোহরযুক্ত পানীয় পান করাবেন (আবু দাউদ, তিরমিজী)। আর এক হাদিসে নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, আমি ও এতিমের তত্ত্বাবধানকারী জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকবো। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে ইশারা করে দেখান (বুখারী:৫৫৭৯, তিরমিজী: ১৯১৮)। নিঃস্ব বিধবাদের প্রতি সদয় হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনদের ভরণপোষণের চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথের জিহাদকারীর ন্যায়। অথবা সে ওই ব্যক্তির ন্যায় যেদিনে রোজা পালন করে ও রাতে (নফল ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে (বুখারী: ৫৫৮০)। আর একটি ঘটনা আমরা সবাই জানি। একবার ঈদগাহে যাওয়ার পথে এক এতিম বাচ্চাকে কাঁদতে দেখে প্রিয় নবীজী তাকে আদর দিয়ে দুঃখ-দুর্দশার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সব শুনে রসূল (সা.) তাকে নিজবাড়িতে নিয়ে এলেন। গোসল করিয়ে সুন্দর কাপড় পরিয়ে ঈদগাহে নিয়ে গেলেন। এরপর তাকে বললেন, ‘হে বৎস! আমি যদি তোমার বাবা হই, আয়েশা যদি তোমার মা হয় আর ফাতেমা যদি তোমার বোন হয়, তাহলে কি তুমি সন্তুষ্ট?’ ছেলেটি খুশিতে জবাব দিলো, হ্যাঁ, অবশ্যই। এবার তার চেহারায় আনন্দের রেখা ফুটে উঠলো। আজ লজ্জায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে যায় এই মহান নবীর উম্মত দাবি করতে। আমাদের মধ্যে কি এর বিন্দুমাত্রও আছে?
অধীনস্তদের প্রতি ব্যবহার:
কথায় বলে, তেলা মাথায় ঢালো তেল, রক্ষ্ম মাথায় ভাঙো বেল। এ প্রবাদটির বাস্তব চিত্র আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অধীনস্ত চাকর-নকর, শ্রমিক-কর্মচারী এবং কাজের লোকদের সাথে আজ আমরা কেমন আচরণ করি? অথচ আমরা যার উত্তরসূরী হিসেবে গর্ব করি, সেই মহামানব মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আদর্শ কি আমরা মেনে চলি? হুজুর (সা.) তাঁর অধীনস্ত কাজের লোকদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও বিরল। চাকর-নকর, খাদেম ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের প্রতি ভালো ব্যবহারের তাকিদ দিয়ে মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, তারা তোমাদের ভাই ও তোমাদের খাদেম। মহান আল্লাহপাক তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। অতএব তোমাদের যার অধীনে তার ভাই আছে, তাকে তাই খাওয়ানো উচিত যা সে নিজে খায়, তাকে তাই পরানো উচিত যা সে নিজে পরে। সামর্থ্যরে বাইরে কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না। আর এ ধরনের কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে তবে তাদের কাজে তুমিও সাহায্য করো (বুখারি: ১৩৬০)। আনাস (রা.) বলেন, আমি দশ বছর নবীজির খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি উহঃ শব্দ বলেননি। এ কথা জিজ্ঞাসা করেননি তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না (বুখারী:৫৬১২)। সোব্হানাল্লাহ, নবীজির কি আখলাক!
পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর প্রতি আচরণ:
সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হুজুর (সা.) পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীসহ সর্বস্তরের মানুষের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি শুধু বলার মধ্যেই সীমিত থাকেননি, বরং বাস্তবে নিজে আমল করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি ছোট বেলা থেকেই মা-বাবাকে হারিয়েছেন। এ কারণে তার পিতা-মাতাকে সরাসরি খেদমত করার সুযোগ হয়নি। বর্ণিত আছে, কোন সময় যদি তার দুধ-মা হালিমা আসতেন, তখন তিনি সম্মানার্থে তার মাথার পাঁগড়ি বিছিয়ে বসতে দিতেন। তিনি বলতেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখার ব্যাপারে হুজুর (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানের সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষদিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক যুক্ত রাখে (বুখারী:৫৭০৮)। তিনি আরও এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিযক প্রশস্ত করা হোক এবং আয়ুবৃদ্ধি হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখে (বুখারী: ৫৫৬০)। প্রতিবেশীকে সাহায্য করার ব্যাপারে তিনি বলেন, সে মুমিন নয় যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত্রিযাপন করে।
চলছে রবিউল আউয়াল মাস। পৃৃথিবীতে সুমহান আদর্শ ও উত্তম চরিত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যই আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইংরেজি ৫৭০ সনে এবং আরবি ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল মাসের ৯ কিংবা ১২ তারিখ সোমবার বিশ্ব-মানবতার মুক্তিদূত মহানবী (সাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। এ কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণের কাছে রবিউল আউয়াল মাসের একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এই মাসে মুসলমানগণ মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। মহানবীর ক্ষমা, ধৈর্য, দয়া, উদারতা ও মহানুভবতার কথা লিখে কখনও শেষ করা যাবে না। তিনি যেন এক ‘জীবন্ত আদর্শকোষ’। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, নিশ্চয়ই তার রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব: ২১)। তাই আসুন, আমরা তার জীবনাদর্শে নিজেকে রঙিন করে তুলি এবং মহান আল্লাহর প্রিয় পাত্র হিসেবে নিজেকে কবুল করিয়ে নিই। (লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়)

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More