কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় শিশুসহ নিহত ৬০

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। আফগানিস্তানের এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, বিস্ফোরণে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছে। আর আহত হয়েছে ১৪০ জন।
তালেবান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এই জোড়া বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিস্ফোরণে ১২ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে বিবিসি। একজন তালেবান কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকালে কাবুলে বিমানবন্দরের এবি গেইটের বাইরে ভিড়ের মধ্যে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে ব্যারন হোটেলের কাছে আরেকটি বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, হতাহতদের মধ্যে মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে গার্ডিয়ান লিখেছে, ইসলামিক স্টেটের খোরাসান গ্রুপ এর পেছনে থাকতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, কাবুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের বিষয়টি এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরের বাইরে কারা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট অব খোরাসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি) বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে কাবুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা করছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া। এ কারণে নিজেদের নাগরিকদের বিমানবন্দরে যেতে মানাও করেছিল তারা। বিমানবন্দর ঘিরে থাকা আফগানদেরও চলে যেতে বলা হয়েছিল। কাবুল বিমানবন্দরে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা।
দুদিন আগেই জি-৭ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছিলেন, কাবুল বিমানবন্দরের কাছে ‘আইএসআইএস’ নামে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হামলা করতে পারে। তারা তালেবানবিরোধী। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া তাদের নাগরিকদের কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে সাবধান করে দেয়। তাদের বলা হয়েছে, তারা যেন কাবুল বিমানবন্দর আপাতত এড়িয়ে চলেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার বলেছিল, বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তাই কেউ যেন কাবুল বিমানবন্দরে না যান। যারা বিমানবন্দরের আশপাশে থাকেন, তারা যেন দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান এবং পরবর্তী বার্তার জন্য অপেক্ষা করেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই কারণ দেখিয়ে তাদের দেশের নাগরিকদের বলে, ‘আপনারা যদি অন্য কোনোভাবে নিরাপদে আফগানিস্তান ছাড়তে পারেন, তাহলে অবিলম্বে সেটা করুন।’ আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সেনা, আফগান নাগরিক এবং সহযোগীদের সরিয়ে নিতে ব্যাপক বেগ পোহাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের। নির্ধারিত সময়ের পর আর সময়সীমা বাড়ানো হবে না বলে আফগানিস্তানের নতুন শাসকগোষ্ঠী তালেবান সতর্ক করে দেয়ার পর হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পশ্চিমারা। আগামী সপ্তাহে কাবুল বিমানবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়ার কথা রয়েছে তাদের। বুধবার সন্ধ্যার দিকে জারিকৃত এক সতর্কবার্তায় কাবুলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস মার্কিন নাগরিকদের কাবুল বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। অজ্ঞাত ‘নিরাপত্তা হুমকি’ উল্লেখ করে যারা এরই মধ্যে বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে আছেন, তাদের অবিলম্বে সেখান থেকে নিরাপদ এলাকায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী জেমস হিপ্পি বলেন, আইএস জঙ্গিদের সম্ভাব্য আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রবল হুমকি আছে। বিবিসি রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতিকে অস্বীকার করতে পারি না। কাবুলে হামলার এই হুমকি বিশ্বাসযোগ্য এবং এটি আসন্ন। একই সঙ্গে তা ভয়াবহ প্রাণঘাতী হতে পারে। আমরা যদি আসলেই উদ্বিগ্ন না হই, তাহলে ইসলামিক স্টেটকে একটি লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ দেয়া হবে। যার ভয়াবহতা অকল্পনীয় হতে পারে।’
এদিকে কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষারত হাজার হাজার লোককে নিরাপত্তা দিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছে তালেবান। বৃহস্পতিবার গোষ্ঠীটির একজন কর্মকর্তা বলেন, তাদের রক্ষীরা বেসামরিকদের রক্ষায় নিয়োজিত থাকবে। পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে তিনি বলেন, ‘কাবুল বিমানবন্দরে আমাদের রক্ষীরাও জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, তারাও ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর হুমকির মুখে আছে।’ তার এই আশঙ্কার মধ্যেই হামলার ঘটনাটি ঘটলো।
একই দিন আফগানিস্তানের রাজধানীতে ন্যাটোভুক্ত একটি দেশের এক কূটনীতিক বলেন, তালেবান রক্ষীরা কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে নিরাপত্তার প্রতিশ্রম্নতি দিলেও ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের আসন্ন হুমকির বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। এসব প্রতিবেদনের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া কাবুল বিমানবন্দরের সামনে থেকে তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সতর্ক করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘পশ্চিমা বাহিনীগুলো কোনো পরিস্থিতিতেই আফগানিস্তানে কারও বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বা আত্মরক্ষামূলক কোনো হামলা চালানোর অবস্থানে যেতে চাইছে না। আমাদের আদেশ হলো, ৩১ আগস্টের মধ্যে সবাইকে সরিয়ে নেয়া নিশ্চিত করা।’ ১১ দিন আগে তালেবানের হাতে পতন হওয়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে এ পর্যন্ত ৮২ হাজারেরও বেশি মানুষকে বিমানযোগে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। আর আকাশপথে দেশটি ছাড়ার আশায় হাজার হাজার লোক বিমানবন্দরটির ভেতরে ও বাইরে অপেক্ষা করে আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনীগুলো আফগানিস্তান ছাড়ার পর কাবুল বিমানবন্দর চালাতে তুরস্কের কাছে কারিগরি সহায়তা চেয়েছে তালেবান। একই সঙ্গে তারা বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী ৩১ আগস্টের মধ্যে তুরস্কের সেনাদেরও যে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে তাও জোর দিয়ে বলেছে বলে তুরস্কের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ২০ বছর পর ফের আফগানিস্তানের শাসনভার নিতে যাওয়া তালেবানের শর্তসাপেক্ষে করা অনুরোধ মেনে নিয়ে বিমানবন্দর পরিচালনার মতো বিপজ্জনক কাজের ভার নেওয়া হবে কি হবে না, সে ব্যাপারে আঙ্কারা এখনো দ্বিধাগ্রস্ত বলে জানিয়েছেন দেশটির এক কর্মকর্তা।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তুরস্কও আফগানিস্তানে ন্যাটো মিশনের অংশ ছিলো। এখনো কাবুল বিমানবন্দরে আঙ্কারার কয়েকশ সেনা অবস্থান করছে। তবে তারা অল্প সময়ের নোটিশেই আফগানিস্তান ছাড়তে পারবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীনরা অনুরোধ করলে কাবুল বিমানবন্দরে সেনা উপস্থিতি থাকতে পারে বলে কয়েক মাস ধরেই বলে আসছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। কট্টর ইসলামপন্থি গোষ্ঠী তালেবান রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তুরস্ক কাবুল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও কারিগরি সহায়তারও প্রস্তাব দেয়। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তুরস্কের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তালেবান কাবুল বিমানবন্দর পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। কিন্তু তালেবানের দাবি অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে তুরস্কের সব সেনা সরিয়ে নিলে সেখানে সম্ভাব্য যে কোনো মিশন জটিল হয়ে উঠবে বলেও তার মত। তিনি বলেন, তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
এদিকে, অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর ধারাবাহিকতায় অবশেষে আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করেছে তুরস্ক। বুধবার তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০২ সাল থেকে আফগানিস্তানে জাতিসংঘ ও ন্যাটো বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেছে তুরস্ক। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় আফগান জনগণের শান্তি, কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করে তুর্কি বাহিনী। নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনের গৌরব নিয়ে তারা দেশে ফিরছে। তবে শেষ পর্যন্ত তালেবানের শর্ত মেনে আফগানিস্তানে সেনা না রেখে তুরস্ক কাবুল বিমানবন্দর চালাতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে রাজি হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ৩১ আগস্টের মধ্যেই হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির আরেক কর্মকর্তা। বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী ৩১ আগস্টের মধ্যেই সব বিদেশি সেনার আফগানিস্তান ছাড়ার কথা, এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে দুই দশক ধরে চলা সামরিক অভিযানও শেষ হওয়ার কথা। বিদেশি সেনারা হস্তান্তর করে দেয়ার পর কাবুল বিমানবন্দর চালু রাখা কেবল আফগানিস্তানের সঙ্গে বাকি বিশ্বের যোগাযোগের জন্যই নয়, দেশটিতে ত্রাণ সরবরাহ এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তালেবান কাবুল দখলের পর এখন পর্যন্ত তাদের দেয়া ‘উদার বিবৃতিগুলোর’ প্রশংসা করেছে তুরস্ক; আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারেও তারা আগ্রহ দেখিয়েছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More