কেরুজ চিনিকলে চলতি মরসুমে ৬৭ আখ মাড়াই দিবস আজ : আগামী মরসুমে হুমকির মুখে ডিস্ট্রিলারি

বয়সের ভারে নূহ্য মিলটি শরণকালের রেকর্ড ভাঙলো : দেখা দেয়নি যান্ত্রিক ত্রুটি

দর্শনা অফিস: ৮৩ বছর বয়সি বুড়ো কেরুজ চিনিকলটি এবারের আখমাড়াই মরসুমে চমক সৃষ্টি করলো। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা মিলটি চলতি আখ মাড়াই মরসুমে একবারের জন্যও যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়েনি। অন্যান্য মাড়াই মরসুমের তুলনায় এবারের মরসুমে আখ মাড়াইয়ের গড় হারও তুলনামূলক বেশি। চিনি আহরণের গড় হার বৃদ্ধি না পেলেও চিনির গুনগত মান এবার বেশ ভালো। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের দক্ষতা, শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের ফসল বলেই মন্তব্য সুধীমহলের। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ডিসেম্বর কেরুজ চিনিকলের ২০২০-২১ আখ মাড়াই মরসুমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিকটন আখ মাড়াই করে ৯ হাজার ৬২৫ মেট্রিকটন চিনি উৎপাদন করবে কেরুজ চিনিকল। কেরুজ চিনিকলের নিজস্ব ১ হাজার ৫৫০ একর জমিতে ২৪ হাজার মেট্রিক টন আখ, কৃষকের ৬ হাজার ৯শ ৮২ একর জমিতে ৯৪ হাজার মেট্রিকটন আখ দ-ায়মান ছিলো। এছাড়া বন্ধ হওয়া কুষ্টিয়া জগতি চিনিকলের আওতাধীন কৃষকদের ৩৬ হাজার মেট্রিকটন আখ মাড়াই করা হওয়ার কথা ছিলো কেরুজ চিনিকলে। শেষ অবধি তা কমে ২৫ হাজার মেট্রিকটনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাকি ১১ হাজার মেট্রিক টন আখ গুড় উৎপাদক করবে চাষিরা। যে কারণে কেরুজ চিনিকলে এবারের মরসুমে সর্বমোট আখ মাড়াই হতে পারে ১ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিকটন। যে কারণে মাড়াই দিবস বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০। চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশশিক ২৫ শতাংশ। গতকাল সোমবার চলতি আখ মাড়াই মরসুমের ৬৬ দিবস ছিলো। ৬৬ দিবস পর্যন্ত এ চিনিকলে আখ মাড়াই করেছে ৮০ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন আখ মাড়াইয়ের গড় হার ১ হাজার ২২৫ মেট্রিকটন। চিনি উৎপাদন করা হয়েছে ৪ হাজার ২০২ মেট্রিক টন। চিনি আহরণের গড়হার ছিলো ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে গতকাল আহরণের হার বেড়ে দাড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এবার আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে চিনি উৎপাদন হবে ৭ হাজার ১৮৭ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন। কুষ্টিয়া চিনিকলের আওতাধীন ২৫ হাজার মেট্রিক টন আখের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মাড়াই হয়েছে ১১ হাজার ৫৩২ মেট্রিকটন। এবারের আখ মাড়াই মরসুমে কেরুজ চিনিকল লাভের মুখ না দেখলেও বিগত বছরের তুলনায় লোকসানের বোঝা কমতে পারে অনেকটা। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরুজ চিনিকলটি শরণকালের রেকর্ড ভাঙলো এবার। ৬৬ আখ মাড়াই দিবসের মধ্যে ১ মিনিটের জন্যও হয়নি ব্রেকডাউন। কোনো প্রকার যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়তে হয়নি মিলটিকে। চিনিকলের প্রবীণ ও দক্ষ বেশ কয়েকজন শ্রমিক-কর্মচারীর কাছ থেকে কারণ হিসেবে জানা গেছে, ব্যবস্থাপনা পরিষদের দক্ষতা, সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষ লোকবল নিয়োগ, চাহিদা মোতাবেক যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের মালামাল সরবরাহ, বিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন, করোনাকালীন সময়েও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিরলস পরিশ্রম, সকল প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম ধরে ন্যায্য ও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার কারণেই এবার কোন প্রকার যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়তে হয়নি মিলটিকে। যে কারণে চিনি কারখানা যেমন ত্রুটিহীনভাবে চলছে, তেমনি চিনির গুনগত মানও শরণকালের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। উন্নত মানের চিনি উৎপাদন হচ্ছে এ মিলে। তবে আখ মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়তে হবে আগামী ২০২১-২২ মরসুম। দেশের ৬টি চিনিকল বন্ধ হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হওয়ায় চলতি রোপণ মরসুমও পড়েছে মুখ থুবড়ে। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় আখ রোপণ মরসুম। আগামী মার্চ পর্যন্ত রোপণ কার্যক্রম চললেও তাতে দেখা মিলেছে হাতাশা। ৯ হাজার ৩৫০ একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে কেরুজ নিজস্ব জমির পরিমাণ ১ হাজার ৪৪৩ একর ও কৃষকদের ৭ হাজার ৯০৭ একর জমিতে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত টানা ৫ মাস ২২ দিনে রোপণ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৫৫৩ একর জমিতে। এর মধ্যে ৭৬৮ একর কেরুজ নিজস্ব ও কৃষকের জমির পরিমাণ ২ হাজার ৭৮৫ দশমিক ৫০ একর। যদিও চিনিকল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে রোপণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ কার্যক্রম চলবে আগামী মার্চ পর্যন্ত। তবে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ জমিতে আখ রোপণ করা হয়েছে তাতে আগামী ২০২১-২২ মরসুমে আখের পরিমাণ হতে পারে ৪২ হাজার ৬৪২ মেট্রিক টন। গড় আখ মাড়াইয়ের হিসেব আনুযায়ী ওই বছর চিনিকলে আখ মাড়াই হতে পারে মাত্র ৩৪ দিন। আখ রোপণের কারণে শুধু চিনিকলই নয় হুমকির মুখে পড়তে হতে পারে ডিস্ট্রিলারি কারখানা।
কারণ হিসেবে জানা গেছে, কেরুজ ডিস্ট্রিলারি কারখানায় মদ উৎপাদনের একমাত্র কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় মুলাসেস। প্রতি বছর ডিস্টিলারির জন্য মুলাসেস প্রয়োজন প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে কেরুজ চিনিকলে প্রতি আখ মাড়াই মরসুমে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুলাসেস পাওয়া যায়। বাকি ১৪/১৫ হাজার মেট্রিক টন মুলাসেস সংগ্রহ করা হয় দেশের অন্য ১৪টি চিনিকল থেকে। চলতি মরসুমে ৬টি চিনিকল বন্ধ হওয়া আখচাষিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে গোটা দেশেই। যে কারণে এবার কেরুজ এলাকায় আখচাষের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। ফলে চরমভাবে হুমকির মুখে পড়তে হতে পারে কেরুজ ডিস্টিলারি কারখানার উৎপাদন। কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু সাঈদ জানান, ইচ্ছেশক্তি ও আন্তরিকতা থাকলে সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছুনো সম্ভব। কেরুজ চিনিকলটি এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বিভিন্ন কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিলো সরকারের মূল্যবান সম্পদটি। আমি গত বছরের ১২ এপ্রিল কেরুজ চিনিকলে যোগদান করলেও দায়িত্বভার বুঝে পাই ১৬ এপ্রিল। সে সময় দেশে ছিলো করোনার প্রভাব। করোনাকালীন সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি মিলটিকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য। দফায় দফায় বৈঠক করেছি কর্মকর্তা, শ্রমিক-কর্মচারীসহ নেতৃবৃন্দের সাথে। সকলের মতামতে ভালো কিছু সিদ্ধান্ত পেয়েছি। অবলম্বন করেছি সঠিক কৌশল। সে মোতাবেক চিনি কারখানা মেরামতের কাজ শুরু করেছি দক্ষ শ্রমিক-কর্মচারীদের দিয়ে। যখন যেখানে যা যা প্রয়োজন তা সঠিকভাবে মানসম্পন্ন মালামাল সরবরাহ করেছি। তা দক্ষদের মাধ্যমেই স্থাপন করা হয়েছে। সব কাছই করা হয়েছে স্বচ্ছতার সাথে। তাই আজকের এ সুফল মিলের সকল কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের। তবে আমি মনে করি দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে যে যার স্থানে দায়িত্ব পালন করলে তা কখনো বৃথা যায় না। সাফল্যের মুখ দেখবেই। কেরুজ চিনিকলটি এ অঞ্চলকে আলোকিত করে রেখেছে। সেই সাথে করেছে সমৃদ্ধ। তাই সরকারের এ মূল্যবান সম্পদকে বাচিয়ে রাখতে বেশি বেশি করে আখচাষের কোনো বিকল্প নেই।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More