ঝালাই যন্ত্র বিস্ফোরণে ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি নিহত : আহত ৩

ঝিনাইদহে আদালতের মালখানায় মেরামত কাজ চলাকালে দুর্ঘটনা

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মালখানায় ওয়েলডিং মেশিন বিস্ফোরণে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন মালখানায় কর্তব্যরত এসআই ইমামুল হক। রোববার দুপুর দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিকের নাম শফিকুল ইসলাম (২০)। তার বাড়ি সদর উপজেলার উত্তর কাস্ট শেখরা গ্রামে। আহতরা হলেন সদর উপজেলার কাস্ট শেখরা গ্রামের মোস্তাক, আসাদ ও ভগবাননগর গ্রামের রাজিব। আহতদের মধ্যে মোস্তাক ও রাজিবের অবস্থা গুরুতর। দুজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনা তদন্তে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারের পক্ষে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মালখানার দায়িত্বে নিয়োজিত এসআই ইমামুল জানান, দুপুরে মালখানার মধ্যে কাজ করছিল গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদারের ৩/৪ জন শ্রমিক। এ সময় মালখানার কাজে তদারকি করছিলেন কনেস্টেবল অনুপম। হঠাৎ বিস্ফোরণ হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভবনে থাকা পুলিশ সদস্য, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষ ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেন। প্রথমে তিন জন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি ও পরে বিস্ফোরণে শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শফিকুলকে উদ্ধার করে দমকল বাহিনীর সদস্যরা। এদের মধ্যে হাসপাতালে নেয়ার পর শফিকুলের মৃত্যু হয়। মালখানার মধ্যে বিস্ফোরক কোনো দ্রব্য ছিলো না।
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির সোহেল রানা জানান, আদালতের মালখানার পাশেই তার অফিস। দেড়টার দিকে মালখানায় হঠাৎ প্রচ- বিস্ফোরণ হয়। এতে জানালার কাচ ভেঙে তার কক্ষে ঢুকে পড়ে। বের হয়ে দেখেন মালখানার ভেতরে আগুন। ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে গোটা এলাকা। এতে আদালত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দমকল বাহিনীকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দগ্ধ অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে শফিকুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক মারা যান। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় মালখানায় রক্ষিত বিচারাধীন মামলার আলামতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পুড়ে গেছে মূল্যবান জিনিসপত্র। সোহেল রানা অভিযোগ করেন, গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদার বিদ্যুৎ কাজটি করছিলেন। আগে থেকেই ওয়েলডিং মেশিনে ত্রুটি ছিল। বারবার মেশিনটি মেরামতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নষ্ট মেশিন দিয়ে মালখানার ভেতরে র‌্যাক তৈরির কাজ করা হচ্ছিল। এ কারণেই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
অপর প্রত্যক্ষদর্শী জেলা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দে আদালত প্রাঙ্গণ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।
ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ঘটনায় ওয়েল্ডিং কারখানার মালিক শফিকুল নিহত ও তার তিন শ্রমিক আহত হয়েছেন। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে আহত পুলিশ সদস্য অনুপম তার ঊধর্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ওয়েল্ডিং-এর কাজে ব্যবহৃত মেশিনে তিনি আগুন ধরতে দেখেছেন এবং তারপরই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের সময় ওয়েল্ডিং মেশিনের পাশে শফিকুল বসে ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ঝিনাইদহ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মালখানা দীর্ঘদিন অরক্ষিত। মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এর আগে একবার মালখানায় চুরি হয়েছে। সেখানে মূল্যবান মামলার আলামত, বিভিন্ন সময় উদ্ধার হওয়া সোনা, টাকা, মাদক ও দেশি কামারশালার অস্ত্র থাকলেও ঠিকাদারের পক্ষে যারা কাজ করতে প্রবেশ করেছিল তাদের নাম ঠিকানা বা ব্যক্তিগত কোনো তথ্য মালখানার দায়িত্বরত এসআই ইমামুল গণমাধ্যমকে দিতে পারেননি।
পুলিশ সুপার মুনতাসিরুল ইসলামের কাছে চট্টগ্রামে জঙ্গিদের ফাঁসির আদেশের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘এটি নিছক দুর্ঘটনা মাত্র।’
নিহত শফিকুল ইসলামের ভাই ইয়ামিন জানান, সদর উপজেলার মধুপুর চৌরাস্তায় তার চাচা আসাদের ওয়েলডিংয়ের দোকান রয়েছে। ওই দোকানে কাজ করত তার ভাই। তিনি আরও জানান, গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদারের কাজ করেন তার চাচা আসাদ। দুর্ঘটনায় তিনিও (আসাদ) আহত হয়েছেন।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মিথিলা ইসলাম জানান, আহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশ আগুনে ঝলসে গেছে। দুই জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দুর্ঘটনার বিষয়ে ঝিনাইদহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওই বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী জানান, বিদ্যুৎ নামের এক ঠিকাদারের মাধ্যমে আদালতের মালখানায় ১০টি লোহার র‌্যাক তৈরির কাজ চলছিল। ওই সময় ওয়েলডিং মেশিন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বৈজন্ত বিশ্বাসকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন মালখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান ও জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যদার একজন। এছাড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশারকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও অর্থ) একেএম নাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More