দর্শনায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : দুপুরের ভাত খাওয়া হলো না সোহানের

নজরুল ইসলাম: মালিকের নির্দেশ দুপুরের ভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে কর্মস্থলে। তা নাহলে পড়তে হবে জেরার মুখে। কর্মস্থলে দ্রুত ফিরতেই কিশোর কর্মচারীর হাতে তুলে দিলেন নিজ মোটরসাইকেলের চাবি। তাইতো পড়ি কি মরি করে মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটে চলা তার। অপরদিকে গরম ভাত সন্তান খেতে পারবে না। তাইতো গরম ভাত বাতাস করে ঠা-া করছিলেন মা। কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়িতে দুঃসংবাদ। বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে পাকা রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে চুয়াডাঙ্গা আকন্দবাড়িয়ার মেকানিক সোহান। আহতাবস্থায় সোহানকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা যায় সে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের দর্শনা থানাধীন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের নতুনপাড়ার সহিদুল ইসলামের ছেলে দর্শনা বাসস্ট্যান্ড এলাকার মালেক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মেকানিক (শিক্ষানবিশ) সোহান জোয়ার্দ্দার (১৫)। প্রতিদিনের ন্যায় গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে খাবার খেয়ে দ্রুত কর্মস্থলে ফেরার তাগিদেই মালিকের অ্যাপাসি মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা। কিছুদুর যেতে না যেতেই দর্শনা-জীবননগর মহাসড়কের রশিক শাহের মাজারের নিকটবর্তী স্থানে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাখিভ্যানের নিচে। মাথায় প্রচ- আঘাত পাওয়ায় সঙ্গাহীন হয়ে পড়ে সোহান। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নেয়া হয় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দর্শনা থানার ওসি এএইচএম লুৎফুল কবির বলেন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাকা সড়কের ওপর পড়ে গিয়ে প্রচ- আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। ওয়ার্কশপের মালিক আব্দুল মালেক বলেন, দুপুরের খাবার খেতে প্রতিদিনের ন্যায় মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলো সোহান। কিছুক্ষণ পরই শুনতে পায় সে অ্যাকসিডেন্ট করেছে।
পরিবারিক সূত্রে জানা যায়, সোহানের পিতা দিনমুজুর। সোহান ও জিহাদ দুইভাই। অভাব অনটনের সংসার হওয়ায় সোহান ক্লাস সেভেন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। ছোট ভাই জিহাদকে সাথে নিয়ে ওয়ার্কসপের কাজে লেগে পড়েছে। ছোটভাই জিহাদ জানায়, আমি সাইকেলে করে বাড়ি এসে ভাত খেয়ে ওয়ার্কশপে যাচ্ছিলাম। মহাসড়কে উঠতেই দেখি ভাই সঙ্গাহীন হয়ে পাকিভ্যানের ওপর পড়ে আছে।
প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, দুইটি মোটরসাইকেলকে ওভারটেক করতে গিয়ে পাখিভ্যানের সামনে পড়ে। হাইড্রলিক ব্রেক চাপ দিতেই মোটরসাইকেলের ওপর থেকে ছিটকে পড়ে যায় পাকা রাস্তার ওপর। প্রতিবেশিরা জানান, সপ্তাহখানেক আগে এই দুপুর বেলা ভাত খেয়ে একই মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে জোরে পাকা সড়কে উঠতেই সামনে পড়ে যায় অপর মোটরসাইকেল। সে দফায় সোহান কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে যায়। দরিদ্র পরিবারের উর্পাজনক্ষম সন্তানের মৃত্যেতে পরিবার জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের পক্ষে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়না তদন্ত ছাড়াই গতকাল রাত ১০টায় নামাজে জানাজা শেষে গ্রাম্য কবরস্থানে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়।
দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থায়ও সূচিত হয়েছে পরিবর্তন। আর এ পরিবর্তন প্রভাব বিস্তার করছে আমাদের রুচির ওপর। প্রদর্শন প্রভাব (কারও বাইক আছে, আমাকেও কিনতে হবে) কার্যকরী হওয়ায় আমরা অনুসরণ করছি একে অপরকে। নামিদামি বাইক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বাহ্যাড়ম্বর বৃদ্ধিতে সহায়ক। সময় বাঁচানো, দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা ও আরামদায়ক হওয়ায় মোটরসাইকেলের জুড়ি মেলা ভার। সন্দেহ নেই, যাতায়াতের জন্য মোটরবাইক এখন একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। অথচ আশির দশকের দিকে বাইক খুব অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে ছিলো, যা সমাজের স¤পদশালী ব্যক্তিরা ব্যবহার করতেন। সময়ের পরিক্রমায় মানুষের আয় বেড়েছে, পরিবর্তন হয়েছে রুচির। অর্থাভাবে আগে যারা বাইসাইকেলও কিনতে পারতেন না, আয়ের পরিবর্তনে তারাও কিনছেন বাইক। বিয়ের যৌতুক হিসেবে তো এখন কমন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাইক। একদিকে যেমন বিভিন্ন ব্রান্ড ও মডেলের বাইক বের হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে, বেড়েছে ব্যবহারকারীর সংখ্যাও। অপরদিকে তেমনই বেড়েছে দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিশোর ও যুবকদের কাছে বিভিন্ন ব্রান্ডের মোটরবাইক বেশ লোভনীয় একটি বাহন। তারুণ্যে ভরা কিশোর ও যুবকদের বাইকে চড়ে ঘুরে বেড়াতে মন চাইবে এটাই তো স্বাভাবিক! বাইক যারই হোক না কেন, একটু ফাঁক বা চাবি হাতে পেলেই বাইক নিয়ে দিচ্ছে ছুট। পথ চলতে গিয়ে কিশোর ও যুবকদের বাইকের গতি দেখে ভয় পেতে হচ্ছে। দুর্ঘটনার পরিণাম জানা সত্ত্বেও দেখা যায় ১৩-১৫ বছর বয়সী কিশোর হাতে বাইক। আবার কখনো কখনো এমন বয়সের কিশোরদের হাতে দানবরূপী বাইক দিয়ে বাবা অথবা স্বজনদের মুখে দেখা যায় স্মিত হাসি। দেখে মনে হবে, কিশোরদের বাইক চালানো যেনো নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর ১০০ কিঃমি বা তার অধিক গতিতে না চালালে যেনো স্বস্তি নেই তাদের! কে জানে, হয়তো বা প্রিয় সন্তানকে বাইক চালাতে দেখে মনে মনে খুশিও হচ্ছেন কেউ কেউ! আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে কিশোরদের হাতে বাইক তুলে দেয়া, অস্বাভাবিক গতি, সাবধানতার সাথে ওভারটেকিং, চালানো অবস্থায় হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা, কাঁধে কান লাগিয়ে মোবাইলে কথা বলা, ট্রাফিক আইন মান্য না করা, প্রশিক্ষণ না থাকা, অন্যমনস্ক হওয়া, পার্শ্বরাস্তা না দেখা, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গতি না কমানো, হেলমেট ব্যবহার না করাকে দায়ী করছেন সচেতন মহল। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যাবে যে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাজনিত এবং যার অধিকাংশই কিশোর ও যুবক। কিশোর ও যুবকদের এমন নির্মম মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ আপনজনদের সারাজীবন কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক সময় মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতির কারণে পথচারীদেরও দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়, ঘটে প্রাণহানি। কিশোর ও যুবকদের অকাল মৃত্যুতে বাবা-মা হচ্ছেন সন্তানহারা, সন্তান হচ্ছে বাবা হারা, স্ত্রী হচ্ছেন স্বামী হারা। আর শুরু হচ্ছে ওই পরিবারে সারাজীবনের কান্না। প্রাপ্তবয়স না হওয়া পর্যন্ত যেনো কিশোরদের হাতে তুলে না দেয়া হয় দানবরূপী মোটরসাইকেল। তবেই হয়তো কমবে দুর্ঘটনা, থামবে পরিবারের সদস্যদের সারাজীবনের কান্না।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More