দেশে করোনা পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়

 স্টাফ রিপোর্টার:নোভেল করোনা ভাইরাস দেশের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘশ্বাস শুধু বাড়াচ্ছেই না,সংক্রমণ ও প্রাণহানী পরিস্থিতি তাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার তিন মাসের মাথায় যেখানে অনেক দেশে রোগীর সংখ্যা কমেছে,সেখানে বাংলাদেশে তা ক্রমশ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আদৌ সামাল দেয়া সম্ভব হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।তাছাড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপ হ্রাসে বিশ্বর বহু দেশে লকডাউন যেভাবে সুফল বয়ে এনেছে,সেই লকডাউন বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের আছে কি না,সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিশেষজ্ঞদেরই অনেকে।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত তথা কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ওই মাসের শেষ দিকেই দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সব কিছু বন্ধ অবস্থায় চলে টানা দুই মাস। ৩১ মে সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার কিছু দিন আগে ঈদ সামনে রেখে বিধি-নিষেধ শিথিল করা হয়। ফলে বিপণি বিতান ও দোকানপাট খুলতে শুরু করে। এরপরই বাড়তে থাকে সংক্রমণ। ১ জুন থেকে অফিসের পাশাপাশি গণপরিবহনও চালু হওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত ও এতে মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে বাংলাদেশে। দিন গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে এগুচ্ছে। কয়েক দিনে মৃত্যুও বেড়েছে কয়েক গুণ। গত ২৬ মে পর্যন্ত ৭৯ দিনে যেখানে শনাক্ত কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৬৫০ জন, সেখানে ‘স্বাভাবিক জীবনের’ এই ২১ দিনে রোগী ৬৫ হাজার ৮৩১ জন বেড়ে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৪৮১ জনে। মৃতের সংখ্যাও বেড়ে ১ হাজার ২৬২ জন হয়েছে। তাছাড়া উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে আশঙ্কাজনকহারে। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়ে হয়রানীর বর্ণনাপ্রায় প্রতিদিনই কম বেশি উঠে আসছে গণমাধ্যমে। এরই এক পর্যায়ে হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেছেন,“এ সময় রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা,কিন্তু জনগণের মধ্যে উদাসীনতা,অসহযোগিতার কারণে সংক্রমণ কমল না। তারা লকডাউন মানছে না। তাদের শিথিলতার কারণে সংক্রমণের হার বেড়ে যাচ্ছে।” বিধি-নিষেধ শিথিলের পর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) থেকে এলাকা ধরে ধরে ‘রেড জোন’ চিহ্নিত করে লকডাউনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার বাস্তবায়ন কতটা ঘটবে,তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন,“অযথা লকডাউন লকডাউন খেলা করে লাভ নেই। লকডাউন করতে গেলে সিরিয়াসলি কাজ করতে হবে।”  রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে পরীক্ষামূলক লকডাউনে কী সুফল পাওয়া গেল,তা প্রকাশ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অধ্যাপক নজরুল। তিনি বলেন, লকডাউনের সুফল খোলামেলাভাবে সরকারকে প্রকাশ করতে হবে। সারা দেশে বিভিন্ন জোন শনাক্ত করতে গিয়ে যে ‘সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পাচ্ছে, এরকম লকডাউনে কী হবে? এ প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, আমি অত্যন্ত শঙ্কিত লকডাউন ঠিকমতো করতে পারবে কি না? লকডাউন করার সক্ষমতা সরকারের আছে কি না,এটা আমার সন্দেহ হচ্ছে।”

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় শনাক্ত রোগীকে অন্যদের থেকে দ্রুত আলাদা করে তার ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়াও জরুরি। এক্ষেত্রেও ঘাটতি দেখছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন,“আমাদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে ঘাটতি আছে। এতে আমাদের পেশেন্টদের ক্ষতি হচ্ছে।” কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের মধ্যে যারা হাসপাতালে ভর্তি তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য হাইপোন্যাজাল ক্যানুলা জরুরি হলেও তার সংকট রয়েছে।“হাইপোন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে আমরা ভালোমতো অক্সিজেন নিতে পারি। এই ক্যানুলা তাড়াতাড়ি বিদেশ থেকে কিনতে হবে,সাপ্লাই দিতে হবে।” তাছাড়া মহামারী মোকাবেলায় সরকার দেশের স্বাস্থ্যখাতের সামর্থ্যের পুরোটুকু ব্যবহার করতে পারছে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি বলেছেন,“আমাদের যে সক্ষমতা যা আছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়নি। হয়ত কয়েকটা হাসপাতাল ডেডিকেটেড করা হয়েছে, কিন্তু এভাবে দুই-একটা হাসপাতাল ডেডিকেটেড করে তো লাভ হবে না। ওখানে কিন্তু আমরা নতুন কিছু উপাদান দিচ্ছি না। সক্ষমতা হয়ত কাগজে কলমে আছে,কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে করতে পারছে না।” অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব মনে করেন, কোভিড-১৯ আক্রান্তদের সেবায় দেশের সব সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি আরও বেশি বেসরকারি হাসপাতালকে অন্তুর্ভুক্ত করতে হবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান গতিতে উদ্বিগ্ন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন,“সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্তের হার ৩৭ শতাংশ (পরীক্ষা বিবেচনায়),বাংলাদেশে সে হার ২০ বা ২১ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। খুব বেশি পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। সংক্রমণ বাড়ছে দিন দিন। “এখন যেটি করতে হবে, সক্রিয় রোগী শনাক্ত করে কমিউনিটি থেকে আলাদা করা। অ্যাকটিভ রোগীকে আইসোলেট করতে হবে, দ্রুত ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। দুটো জিনিস মিলিয়ে সংক্রমণের হার নামাতে হবে।” কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক বলেন,“এই ভাইরাস কিন্তু আপনাআপনি পিকে উঠে নেমে যাবে,এটা মনে করার কোনো কারণ নাই। তখনই নেমে যাবে যখন আমরা ভাইরাসের সংক্রমণটা সক্রিয়ভাবে সামাজিক পর্যায়ে রোধ করতে পারব। এটার সাথে সিজনের কোনো সম্পর্ক নাই,এটার সাথে ভাইরাস দুর্বল হয়ে পড়ার কোনো সম্পর্ক নাই। এটা সে ধরনের ভাইরাস নয়।নমুনা পরীক্ষা বাড়িয়ে রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশনে পাঠানোর উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।এছাড়া নমুনা পরীক্ষা ছাড়াও রোগীর লক্ষণ-উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা সন্দেহভাজন রোগীর তালিকা তৈরি করে তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠাতে পারেন বলে মনে করেন ওই গবেষক। সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ হিসেবে  তবে‘কঠোর লকডাউন’বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোভিড-১৯ বিষয়ক মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান বলেন,“সংক্রমণ কমাতে এই মুহূর্তে ভাবনা হচ্ছে, রেড জোন,ইয়েলো জোনে ভাগ করে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করা। লকডাউন বাস্তবায়নের পথে আমরা অনেকগুলো সাব জোন করছি। “এই প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা ধরনের পরামর্শ আসছে। আমরা সেগুলো সমন্বয় করে লকডাউন বাস্তবায়ন করব। এটাই সংক্রমণ কমানোর একমাত্র উপায় বলে ভাবছি আমরা।” তবে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা একটি কমিটি গঠন করে ‘কঠোর লকডাউন’ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More