চুয়াডাঙ্গায় করোনায় একজনের মৃত্যু : উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৪

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজনসহ উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সদর হাসপাতালের হলুদ জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজন এবং ঢাকায় নেয়ার পথে আরও একজনের মৃত্যু হয়। এদিকে, চুয়াডাঙ্গায় আরও ৩৩ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে পাওয়া ১৫৭ জনের ফলাফলে ৩৩ জনের পজেটিভ আসে। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১০৯১ জনে। এর মধ্যে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.শু বাঙালীর করোনা রিপোর্ট পজেটিভ আসে। নতুন আক্রান্ত ৩৩ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ১৯ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৪ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ৭ জন ও জীবননগর উপজেলার ৩ জন রয়েছেন। গতকাল পরীক্ষার জন্য আরও ৬০ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া জীবননগরের ধোপাখালি গ্রামের ফুল ব্যবসায়ী দরবেশের মৃত্যুর একদিন পর করোনা পরীক্ষা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, করোনা উপসর্গ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটের হলুদ জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নারীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার পিরপুর কুল্লা গ্রামের মৃত নিয়ত আলীর ছেলে আব্দুস সাত্তার (৬৫), চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার কোর্টপাড়ার সামসুল আরেফিনের স্ত্রী নিগার সুলতানা (৪৬) ও চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মুক্তিপাড়ার মৃত নিয়াজ আলীর স্ত্রী মাজেদা বেগম (৭০)।

গত রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর দুইটার দিকে পরিবারের সদস্যরা আব্দুস সাত্তারকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়। আব্দুস সাত্তারের শরীরে ঠা-া, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ করোনা উপসর্গ থাকায় জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি রখেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দিবাগতরাত সাড়ে ১২টার দিকে মারা যান তিনি।

সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরেক রোগী নিগার সুলতানা। তিনি কিছুদিন যাবত ঠা-া, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। নিজ বাড়িতেই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে গত সোমবার পরিবারের সদস্যরা তাকে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়। এ সময় নিগার সুলতানার শরীরে করোনা উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি রাখেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে, ঠা-া, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মাজেদা বেগম (৭০) নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে গতকাল সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকালই সন্ধ্যা ৭ টার দিকে মারা যান মাজেদা বেগম। মৃত্যুর পর তার শরীর থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

এছাড়া, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে পরিবহন ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম খোকনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। নিহত জহুরুল ইসলাম জীবননগর উপজেলার পোস্ট অফিসপাড়ার মৃত শওকত আলীর ছেলে। জানা যায়, জহুরুল ইসলাম খোকন দীর্ঘদিন যাবত জ্বর, ঠা-াসহ শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। গতকাল বাদ আসর নামাজ শেষে জীবননগর পৌর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মরহুমের নামাজের জানাজা শেষে পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে করোনা প্রটোকলে তার দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। এদিকে, শরীরে করোনা উপসর্গ ঠা-া, জ্বর থাকায় গত সোমবার তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন।

সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১২ আগস্ট বুধবার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ১০২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে। ওই ১০২ জনেরসহ সোমবারের ৮৪টির মধ্যে ৫৫ জনের মোট ১৫৭ জনের নমুনার ফলাফল আসে। তার মধ্যে ৩৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২৬ জন ও নারী ৭ জন। বয়স ৭ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত।

এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার মারা যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা আশু বাঙালী করোনা পজেটিভ এসেছে। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান। বীর মুক্তিযোদ্ধা আশু বাঙালী দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজবাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সম্প্রতি তার শরীরে করোনা উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে গত সোমবারর তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এসে নমুনা দেন। এদিকে গতকাল রাতেই উক্ত নমুনার ফলাফল এসে পৌঁছায়। এতে তার শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। ফল পৌঁছানোর আগেই মঙ্গলবার বিকেলেই তার মৃত্যু হয়।

নতুন আক্রান্ত ৩৩ জনের মধ্যে সদর উপজেলার জাফরপুর গ্রামের ১ জন, রেলপাড়ার ১ জন, কেদারগঞ্জপাড়ার ১ জন, গুলশানপাড়ার ১ জন, মনিরামপুর গ্রামের ১ জন, হাসপাতালপাড়ার ১ জন, চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্যবিভাগের ১ জন, ঈদগাপাড়ার ১ জন,  কোর্টপাড়ার ১ জন, পীরপুর গ্রামের ১ জন, পুলিশ লাইনের ১ জন, ছয়ঘড়িয়া গ্রামের ১ জন ও কুলচারা গ্রামের ১ জন রয়েছেন। আলমডাঙ্গার উপজেলার খাদিমপুর গ্রামের ১ জন, রামচন্দ্রপুর লক্ষ্মীপুরের ১জন, আলমডাঙ্গার চিৎলা গ্রামের ১জন, জীবননগর উপজেলার ধোঁপাখালী গ্রামের ১ জন, জীবননগর স্বাস্থ্য বিভাগের ১ জন ও দামুড়হুদা উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের ১ জন রয়েছেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শামীম কবির জানান, গতকাল মঙ্গলবার হাসপাতালের ইয়োলো জোনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর করোনা পরীক্ষার জন্য তাদের নমুনা সংগ্রহ করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া সোমবার সংগৃহিত নমুনায় গতকাল বিকালে মারা যাওয়া আশু বাঙ্গালীর নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ৪৫৪১ টি, প্রাপ্ত ফলাফল ৪৩৮২ টি, পজেটিভ ১০৯১ জন, নেগেটিভ ৩২০১ জন। ফলাফল পেতে বাকী আছে ১৫৯ টি নমুনার। গতকাল চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হোম আইসোলেশন থেকে ১০ জন ও আলমডাঙ্গা উপজেলার হোম আইসোলেশন থেকে ৭ জনসহ নতুন ১৭ জন সুস্থ হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট সুস্থতার সংখ্যা ৫৬২ জন ও মৃত্যু ২২ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জেলায় গতকাল হোম আইসোলেসনে ছিলো ৪৪৬ জন ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে ছিলো ৫৯ জন।

জীবননগর ব্যুরো জানিয়েছে, জীবননগর উপজেলায় করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে তরুণ ব্যবসায়ী মিষ্টভাষী ও সদা হাস্যজ্জ্বোল জহুরুল ইসলাম খোকনের (৩৬) মৃত্যু হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকায় নেয়াকালে তার মৃত্যু হয়। খোকন শহরের পোস্টঅফিসপাড়ার শ্রমিক নেতা মৃত শওকত আলীর বড় ছেলে। এর মাত্র একদিন পূর্বে সোমবার করোনারা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে শহরের তরুণ ফুল ব্যবসায়ী দরবেশ আলী দফাদারের মৃত্যু হয়। গতকাল তার করোনা রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে। তার বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিটল-টাটা মোটর্সের এ অঞ্চলের বিক্রয় প্রতিনিধি ও সোনারতরী পরিবহনের জীবননগর কাউন্টারের পরিচালক জহুরুল ইসলাম বেশ কিছু দিন ধরে করোনার উপসর্গ জ¦র, সর্দি-কাশি ও শ^াসকষ্ট নিয়ে ভুগছিলেন। গতকাল সকালে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে সকাল সাড়ে ৬টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করা হয়। তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিলো। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেন। দুপুরে ঢাকায় নেয়ার পূর্ব মুহূর্তে তার মৃত্যু হয়। এর পূর্বদিন করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য তার নমুনা নেয়া হয়। গতকলাই বাদ আসর জীবননগর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাজে জানাজা শেষে তাকে বেদনা বিধুর পরিবেশে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি মা, স্ত্রী, ২ ছেলে ও ২ ভাইসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এদিকে সর্বশেষ পাঠানো ১৬ জনের মধ্যে গতকাল ২ জনের করোনা ভাইরাস পরীক্ষার রিপোর্ট এসেছে। এর মধ্যে ধোপাখালীর ফুল ব্যবসায়ী ও যুবলীগ নেতা মৃত দরবেশের করোনা পজেটিভ। তার বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালের একজন কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের দ্বিতীয় দফা পরীক্ষায়ও করোনা পজেটিভ এসেছে। তাকে আইসোলেসনে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেয়ে উথলী ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল হতে গতকাল বাড়ি ফিরেছেন বলে জানা গেছে।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More