মুদ্রায় কি মোছে শোকের কান্না?

সম্পাদকীয়

সীতাকুণ্ডের মতো মৃত্যুকু- বহুবার দেখেছি আমরা। ভবন ধ্বসে পড়া স্পেক্ট্রাম, ফিনিক্স, শাঁখারী বাজার থেকে রানা প্লাজা। গার্মেন্টেস, বস্তি, বিপনী বিতান, অফিস আর আবাসিক ভবনের আগুনের ফর্দটা বেশ বড়। আছে লঞ্চ ডুবির হাহাকারও। নিমতলীর কেমিক্যাল কারখানা, মগবাজার, নারায়ণগঞ্জের গ্যাস বিস্ফারণের ঘটনার ক্ষত এখনও দগদগে। কিন্তু সেই ক্ষতের পীড়ন শুধু হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনেরাই সয়ে যাচ্ছে। যারা দগ্ধ, আহত হয়ে বেঁচে আছেন, তারা জানেন জীবন কতো বিভীষিকাময়। কিন্তু যে দফতর ও প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে শহর, দেশ, তাদের যেন ঘুম ভাঙে না।

যে কোনো দুর্ঘটনার পর, কখনো দেখিনি পরের দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। তাৎক্ষণিক কমিটি তৈরি, দপ্তর প্রধানদের দৌঁড়ঝাপ, টাস্কফোর্স গঠন হয়ে যায় আগুন নিভে যাওয়া বা দুর্ঘটনার আহাজারী প্রতিধ্বনিত থাকা অবস্থাতেই। কিন্তু ঘটনার স্মৃতি বছর বা দশক পেরিয়ে গেলেও কমিটি, টাস্কফোর্স বা মন্ত্রী, আমলাদের নির্দেশনার কোন বাস্তবায়ণ দেখা যায় না। বরং আরেকটি একই আকারের বা তার চেয়েও ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়-দুর্ঘটনার পর ঘুম থেকে জেগে উঠে তদারক প্রতিষ্ঠান। চোখ কচলাতে কচলাতে বলে- লঞ্চ বা বাসের রুট পারমিট, লাইসেন্স ছিলো মেয়াদোত্তীর্ণ, চালকের লাইসেন্স ছিলো না। ভবনের গ্যাস বিদ্যুতের সংযোগ ছিলো অবৈধ, ভবনের নকশার অনুমোদন ছিলো না, মার্কেট বা বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা ছিলো না। সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডের পরেও দেখলাম বিস্ফোরক অধিদপ্তর বলছে, রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের কথা জানানো বা অনুমোদন নেয়া হয়নি। কন্টেইনার ডিপো জলের নিচে নয়, ওপরেই ছিলো। তবু তাদের চোখে পড়েনি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়েরও চোখে জলের বুদবুদ দিয়ে রেখেছিলো ডিপো মালিকেরা। যেজন্য তাদেরও ডিপোটির অস্তিত্ব ছিলো অজানা।

ঘুম পাড়িয়ে রাখার নানা মুদ্রা থাকে মালিক গোষ্ঠীর কাছে। তবে কোনো মুদ্রাতেই মুছে দেয়া যায় না স্বজনের চোখের জল। যে ডেউয়া ফলের আকাক্সক্ষা ছিলো, সেই ফলটিও হয়ে ওঠে অমূল্য। জানি এখানেই শেষ নয়। অবহেলা, অবজ্ঞার জীবনই পুঁজির পর্বত গড়ে দেয়ার কাজে নিরলস রয়ে যাবে। এও জানি পৃথিবীর উষ্ণতায় গলছে বরফের পাহাড়। সবহারাদের দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতার আঁচ পাচ্ছি। পূর্বাভাসটা না হয় আপনারাই বুঝে নেবেন।

উদ্বেগজনক হলো, দেশে অগ্নিকা-জনিত দুর্ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রচুর প্রাণহানিও ঘটছে। তারপরও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন হচ্ছে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সাধারণত দায়ী হোতাদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত কমিটি প্রভৃতির আয়োজন করে কিছুদিন বেশ সরব ভূমিকা পালন করে। পরে বিষয়টি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়।

অগ্নিকা- একই সঙ্গে জীবন ও সম্পদ বিনাশী। এ অবস্থায় সোনাইছড়ির বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধসহ অগ্নিকা-জনিত বিপদ ও ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে সরকার কার্যকর প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হবে-এটাই প্রত্যাশা।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More