লোভে পড়ে অর্থ গোচিয়ে দেয়া বন্ধ হবে কবে

লোভের টোপে অন্ধ না হলে ওদের চেনা খুব সহজ। উৎপাদন করে কোম্পানি নিজের বিক্রয় কেন্দ্রে যে দামে বিক্রি করতে পারে না, সেই দামেরও বহু কমে যারা সেই পণ্য দেবে বলে অগ্রিম টাকা নেই তারা কারা? ওদের ওই লোভের টোপে যারা প্রথম দিকে পা দেন, তারা পণ্য পান ঠিকই, সেটাও টোপেরই অংশ। তবে এই টোপ এই কারণেই দেয়া হয় যাতে বিশ্বাস করে আরও অনেকেই লোভে পড়ে অগ্রিম টাকা দেয়। বেশি দামে কিনে অল্প দামে পণ্য সে যেই দিক তার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করাটাই দায়িত্বশীলতা। অন্যথায় ঠঁকার ঝুঁকি পদে পদে। লোভে পড়ে নিজের টাকা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে অনিশ্চয়তার প্রহরগুণা নিশ্চয় বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
নামি দামি কোম্পানির আনকোরা নতুন পণ্য কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে দিচ্ছে কীভাবে? অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেয়ার মুখে রকমারি যুক্তি থাকতেই পারে, সেই যুক্তি কতোটা সবল সেটা না ভেবে অস্তিত্বহীন কোন প্রতিষ্ঠানে লগ্নিকরা যেমন অদূরদর্শিতা, তেমনই ই-কমার্স নামে এ ধরনের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয় জেনেও সরকারের দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। অবশ্য সরকার সম্প্রতি ই-কমার্স নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যেই তা বাস্তবায়নের জন্য প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে টাকা নেয়ার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য দিতে হবে। পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ১০দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে হবে। যদিও এরপরও অর্থ হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা যে হওয়া যাবে না তা নয়। সকলকে সচেতন হতে হবে, থাকতে হবে বিধি প্রয়োগ।
দেশে এখনও ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের সেই কাজলের বিষয়টি চর্চিত হয়। কেন না, তিনি খুব সহজেই মানুষকে বোকাবানিয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার লেনদেন শুরু করেন। লাখে মাসে ১০ হাজার টাকা লাভ দিতে শুরু করলে মানুষ হুড়োহুড়ি শুরু করে। লাইন দিয়ে ওই কাজলের বাড়ি কিম্বা তার নিযুক্ত প্রতিনিধিদের হাতে টাকা লগ্নি করতে থাকে অসংখ্য মানুষ। প্রশ্ন ওঠে, কাজল ওই টাকা নিয়ে কী এমন ব্যবসা করেন যে এক মাসে এক লাখ টাকায় ১০ হাজার টাকা লাভ দিচ্ছেন? প্রশ্নের জবাব না মিললেও নানাভাবে ছড়ানো হয়, তিনি ওই টাকা নিয়ে হুন্ডি করেন। এ কারণে কাজলের নামই হয়ে যায় হুন্ডি কাজল। এক পর্যায়ে কাজলের নিকট লগ্নিকারীর সংখ্যা নির্দিষ্ট হতে থাকে। তহবিলে টান ধরে। কোন ব্যবসাই করতেন না তিনি। লগ্নি নিতেন এক কোটি, তা ভেঙে লাভ বলে লগ্নিকারীদের দিতেন দশ লাখ। এভাবে কাজলের হাতে এক হাতে যেমন কোটি টাকা, অন্য হাতে তখন অর্ধ কোটি টাকা ঘাটতির হিসেবে। পরের টাকা থাকতে থাকতে লাপাত্তা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাজলকে যেমন পথে বসতে হয়েছে, তেমনই শেষের দিকে লগ্নিকারীদের টাকা হারিয়েছে। হুন্ডি কাজল যে শিক্ষা দিয়ে গেছে, সেই শিক্ষা থেকে যে মানুষ শিক্ষা নেয়নি, তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। কয়েক বছর আগে এলো ইউনিপে টু। টাকা লগ্নি করলেই লাভ। মানুষ হুড়িয়ে টাকা দিয়েছে। হঠাৎ একদিন ওয়েবসাইট মুছে লাপাত্তা হয়ে গেলো। লগ্নিকারীদের কেউ অভিযোগ তুললেন, কেউ কেউ লজ্জায় মুখই খুললেন না। এরপর ই-কর্মাস নামে অনেকটা একই কৌশলে প্রায় অর্ধেক মূল্যে নামি দামি কোম্পানির পণ্য দেয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা নিতে লাগলো। অর্থ হাতিয়ে নেয়ারা অঞ্চল ভিত্তিক প্রচার পাওয়ার জন্য কমমূল্যে পছন্দের পণ্য কিছু দেয়া শুরু করলো। প্রচার বাড়তে লাগলো। লগ্নিকারীর সংখ্যাও বেড়ে হাজার দাঁড়ালো কোটিতে। এরপর? সরকার একটু দৃষ্টি দিলো। ইভ্যালি নামের ই-কর্মাস গ্রাহকদের নিকট থেকে কতো টাকা নিয়েছে, কতো টাকার পণ্য দিয়েছে জানতে গিয়ে তদন্তকারীদের চোখ উঠেছে কপালে। ৩৩৯ কোটি টাকার হদিস করতে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। একই কৌশলে আরও যারা গ্রাহকদের অর্থ নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ তালিকায় চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে প্রসার ঘটনো আদিয়ান মার্টও রয়েছে।
দশ বিশ টাকায় লটারির টিকিট কাটা আর অর্ধেক দামে পছন্দের পণ্য পাওয়ার আশায় অগ্রিম টাকা লগ্নি করা এক কথা নয়। লটারির ওই পদ্ধতিটা স্পষ্ট। টিকিট বিক্রির টাকা গচ্ছিত করে তার মধ্য থেকে মোটাঅংকের কিছু টাকা কয়েকজনকে দেয়া হয়। কীভাবে ওই কয়েকজনকে বেছে নেয়া হবে তাও অজানা থাকে না। আর প্রায় অর্ধেক মূল্যে পছন্দের পণ্য? তাও আবার টাকা দিতে হবে দেড় দু’মাস আগে। যাদের হিসেব নম্বরে টাকা দিতে হবে তাদের ব্যবসার অস্তিত্ব বলতে ওই ওয়েবসাইট। ক্ষেত্রে বিশেষ ঝকঝকে কার্যালয়, মালামাল সরবরাহের গাড়ি থাকাও অমূলক নয়। কারণ, শুধু লোভের টোপ দিলেই তো শিকার বেশি পাওয়া যাবে না, বিশ্বাস স্থাপনের মতো কিছু তো থাকতে হবে। বিশ্বাস স্থাপনের জন্যই প্রথম দিকে ওরা অল্প দামে পণ্য দেয়ও। মৎস্য শিকারি যেমন মাছ ধরার আগে চার ফেলে।
এই সমতটের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই ঘোরপ্যাঁচ খুব কম। যাকে সরলসোজা বলা হয়। এদের সামনে যখন কোন লোভের টোপ মেলে ধরা হয়, ছড়ানো হয় চার। তখন হুড়োহুড়ি করে অর্থ গোচিয়ে দেয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। সুযোগটা কাজে লাগায় লোভের টোপ ফেলা চক্র। এ চক্রের সাথে হাতে গোনা কিছু চালাক চতুর থাকে। ওরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদেরও বোকা বানানোর চেষ্টা করে। কখন পারে, কখনো পারে না। না পারলেও যখন ধরা পড়ে তখন বহু লগ্নিকারীর অর্থের হদিস মেলে না। ই-ভ্যালির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বর্তমানে যে সম্পদের হাদিস পেয়েছে ব্যাংক, তা দিয়ে খুব সামান্য সংখ্যক গ্রাহকের লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More