শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি উদ্বেগজনক

সম্পাদকীয়

সিসা একটি ক্ষতিকর পদার্থ যা খাবার, পানীয় ও শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। মাত্রাতিরিক্ত সিসা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি মানুষের হাড়ে প্রবেশ করলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। দেশের সাড়ে ৩ কোটির বেশি শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর সিসা বয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ এর প্রভাবে শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যাহত হয়; কোনো বিষয়ে স্বাভাবিক মনোযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ফলে লেখাপড়ায় দুর্বল হয়ে পড়ে তারা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, শৈশবে যাদের শরীরে সিসার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির প্রমাণ মেলে, বড় হয়ে তাদের নানারকম জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। দেশে বহু শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক গঠন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এর সঙ্গে সিসাদূষণের সম্পর্ক থাকতে পারে। শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া দেশের চার জেলায় শিশুদের রক্তে সিসার সক্রিয় উপস্থিতি মিলেছে; রক্তে সিসার উপস্থিতি থাকা শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের রক্তে এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত, যারা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। সিসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন, যা শিশুদের মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এটি পাঁচ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনে; পুরোপুরিভাবে মস্তিষ্ক বিকশিত হওয়ার আগেই ক্ষতিসাধন করে। মাত্রাতিরিক্ত সিসার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সারা জীবনের জন্য স্নায়বিক, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। এমনকি মারাত্মক সিসাদূষণ অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সিসার বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হারের দিক থেকে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সিসাদূষণের কারণে প্রতিবছর ৩১ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। সিসাদূষণের কারণে যে পরিমাণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, তাতে বার্ষিক ১৬০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়, যা দেশের তৈরি পোশাক খাতের আয়ের প্রায় অর্ধেক। দেশে সিসাদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস পুরোনো সিসা অ্যাসিড ব্যাটারির অবৈধ রিসাইক্লিং কারখানা। কাজেই এসব ব্যাটারির অবৈধ রিসাইক্লিং বন্ধে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রীত হলুদের গুঁড়ার রং উজ্জ্বল করতে বিষাক্ত সিসা ব্যবহার করা হয়। কেউ যাতে হলুদ প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো ধরনের উজ্জ্বল রং সংযোজন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এক গবেষণায় বাজারের বিভিন্ন পণ্যে সিসার উপস্থিতি মিলেছে। চারটি শহরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিশুদের খেলনা, সব ধরনের রং, অ্যালুমিনিয়াম ও সিলভারের হাঁড়িপাতিল, সবজি, চাল ও মসলার নমুনায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শহরগুলো হলো ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা। এ ছাড়া মাটি, ছাই, পোড়ামাটি ও হলুদের গুঁড়ায় সিসার উপস্থিতি দেখা গেছে। দেওয়ালের রং, পানির পাইপ ও ফিটিংস, কসমেটিকস, মাছ ধরার জাল, ড্রিংকস ক্যান, ইলেকট্রনিকস বর্জ্য, হার্বাল ওষুধ ইত্যাদিতে ব্যবহৃত সিসা খাদ্য, পানীয় ও ত্বকের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে, যা শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উদ্বেগজনক হলো, দেশে প্রায় প্রতিটি খাদ্যসামগ্রী নিয়েই চলছে ভেজালের মহোৎসব। ভেজাল রোধে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More