ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে রাশিয়া : দুই দেশের ৯০ জন নিহত

তিন দিক থেকে ঢুকেছে পদাতিক বাহিনী : কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে দফায় দফায় বিস্ফোরণ
মাথাভাঙ্গা মনিটর: ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে শুরু করেছে রাশিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশের পর এই সামরিক হামলা চালানো হয়। কিয়েভের তিন দিক ঘিরে ফেলেছে মস্কো। সেনা ও বিমান বাহিনী হামলায় যোগ দিয়েছে। ইউক্রেনের বড় বড় শহর ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ হামলায় দুই দেশের ৯০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের ৪০ সেনাসহ অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে। আর ইউক্রেনের সেনারা ৫০ রুশ সেনাকে হত্যার দাবি করেছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট সবাইকে অস্ত্র হাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ বিশ্ব নেতারা হামলার জন্য রাশিয়াকে এককভাবে দায়ী করেছে এবং আরো নিষেধাজ্ঞার হুশিয়ারি দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিন হুশিয়ারি দিয়েছেন, বাইরের কোনো শক্তি এই লড়াইয়ে জড়ালে তাকে এমন শিক্ষা দেয়া হবে যা ঐ দেশটি কোনোদিন দেখেনি। রাশিয়ার সামরিক হামলায় ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকে গতকালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের জন্য সবচেয়ে অন্ধকার দিন বলে উল্লেখ করেছেন। আর সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ইউক্রেনে এখন নিরাপদ কোনো স্থান নেই।
হামলার আগেই রাতে এক ভিডিও বার্তায় ইউক্রেনে এক মাসের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কি। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আতঙ্কের কিছু নেই। আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। যে কোনো কিছুর জন্য আমরা প্রস্তুত। আমরা ওদের প্রতিহত করব।’ ইউক্রেনে হামলা শুরুর পরপরই কিয়েভে সতর্ক ঘণ্টা বাজতে শুরু করে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, কিয়েভ শহর ছাড়ছেন মানুষ। মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের সারি। তবে জনশূন্য শহরের কেন্দ্রস্থল। বাস, ট্রেন ও বিমানবন্দরে ভিড় করছেন আতঙ্কিত বাসিন্দারা। অনেকে বোমার হাত থেকে বাঁচতে বেজমেন্ট ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ছুটছেন। রাস্তায় দলবেঁধে লোকজনকে প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হামলার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হতে পারে। হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির মিত্ররা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়ার ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে তারা। তবে পুতিন বলছেন, আত্মরক্ষার অংশ হিসাবেই এই সামরিক অভিযান, এতে কেউ নাক গলালে তাৎক্ষণিক জবাব দেয়া হবে। এছাড়া পুরো ইউক্রেন দখলের কোনো ইচ্ছা নেই বলেও জানান পুতিন। খবর এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের। হামলার আগে রাশিয়ার জাতীয় টেলিভিশনে পুতিনের ভাষণ সম্প্রচার করা হয়। ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের ঘোষণায় পুতিন বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অবিলম্বে আমাদের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের দনবাসের স্বাধীন দুটি প্রজাতন্ত্র আমাদের কাছে সাহায্য চেয়ে অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আমি সেখানে একটি বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পুতিন ভাষণে ইউক্রেন সেনাদের অস্ত্র ত্যাগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সম্ভাব্য রক্তপাতের সব দায় ইউক্রেন সরকারকে নিতে হবে। ইউক্রেন দখলের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার পরিকল্পনাও নেই আমাদের।
ইউক্রেন জানায়, তিন দিকের সীমান্ত দিয়ে তাদের দেশে হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়া, বেলারুশ এবং ক্রিমিয়া সীমান্ত দিয়ে ইউক্রেনে ঢুকে পড়ে রুশ পদাতিক বাহিনী। স্থানীয় সময় সকাল ৬টার দিকে ইউক্রেনের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্তে একযোগে প্রবেশ করে রাশিয়ান ফেডারেশন এবং বেলারুশপন্থি রুশ সেনারা। একই সময় রাজধানী কিয়েভ, পোডিলস্ক, লুহানস্ক, সামি, খারকিভ, ছেরনিহিভ ও ঝিতোমির অঞ্চলে বিমান থেকে বোমা হামলা হয়েছে। রাশিয়ান সেনারা কামান, ভারী সরঞ্জাম এবং ছোট অস্ত্র ব্যবহার করে সীমান্ত ইউনিট, সীমান্ত টহল এবং চেকপয়েন্টগুলোতে আক্রমণ করছে। এমআই-৮ অ্যাসল্ট হেলিকপ্টার দিয়ে রুশ বাহিনী হোস্টমেলের আন্তোনোভ শহরের একটি বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়া বিমানবন্দরটি দখল করে নিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কির প্রশাসনিক সহকারী ওলেকসি আরেস্টোভিচ বলেছেন, আমি জানতে পেরেছি ৪০ জনের বেশি সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ১০ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্র থেকেও হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী এবং ন্যাশনাল গার্ডসহ সীমান্ত রক্ষীরা শত্রুদের জবাব দিচ্ছে।
এর আগে ইউক্রেনে সামরিক শাসন জারির আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কি। বুধবার মধ্যরাতে দেয়া ভাষণে ইউরোপে যে কোনো দিন রাশিয়া বড় ধরনের একটি যুদ্ধ শুরু করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। জেলেনস্কি রাশিয়ার নাগরিকদের এ যুদ্ধের বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাশিয়া হামলা করলে তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে ইউক্রেন। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়া প্রায় দুই লাখ সেনা ও হাজার হাজার সামরিক যানবাহন মোতায়েন করেছে। ভাষণে তিনি জানান, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছেন। জেলেনস্কি বলেন, আমি রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি টেলিফোন কথোপকথন শুরু করেছিলাম। কিন্তু অপরদিকের ফলাফল ছিল নীরবতা। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেসব নাগরিক যুক্ত হতে চান তাদের অস্ত্র সরবরাহেরও ঘোষণা দেন তিনি।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি: ইউক্রেনের সামরিক বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে এ মন্ত্রণালয় জানায়, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর বেশকিছু বিমানঘাঁটির সামরিক অবকাঠামো অচল করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংস করে দিয়েছে রুশ সামরিক বাহিনী।
৫০ রাশিয়ানকে হত্যার দাবি ইউক্রেনের : ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা একটি শহরে হামলা করার পর তা প্রতিহত করার সময় প্রায় ৫০ জন ‘দখলদার রাশিয়ান’ নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইউক্রেনের শাচিসতিয়া শহর ও পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাশিয়ার পাঁচটি বিমান ও একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল সেরহিই শাপটাললা টুইটারে বলেছেন, ‘রাশিয়ার সেনারা শাচিসতিয়া শহরে হামলা করেছিল। শাচিসতিয়া নিয়ন্ত্রণে এসেছে। দখলদার ৫০ রাশিয়ান নিহত হয়েছেন। ক্রামাটোরস্ক জেলায় রাশিয়ার আরও একটি বিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। এ নিয়ে ছয়টি বিমান ভূপাতিত হলো।’ তবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেনের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো বাধা বা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি তারা।
সাইবার হামলারও শিকার ইউক্রেন: ইউক্রেনে বিমান হামলার পাশাপাশি দেশটির সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটগুলোতে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। ফলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ওয়েবসাইটগুলো ‘ডাউন’ হয়ে যেতে দেখা যায়। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের ভাষ্য, ইউক্রেনের শত শত কম্পিউটারে তথ্য মুছে দেয়ার টুল (ডেটা-ওয়াইপিং টুল) পাওয়া গেছে। মার্কিন সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম ম্যান্ডিয়েন্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা চার্লস কারমাকাল বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনের একাধিক বাণিজ্যিক ও সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট মারাত্মক ম্যালওয়্যার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছি।’ মার্কিন কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন যে রাশিয়া সম্ভবত ইউক্রেনে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সাইবার হামলা চালাতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত মাসে বলেছিলেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে সাইবার হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব সাইবার অপারেশনের মাধ্যমে পালটা জবাব দেবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More