কুষ্টিয়ার কাজী আরেফ ও গাংনীর বাকি চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামি সেই রওশন গ্রেফতার

গাংনী প্রতিনিধি: মেহেরপুরের গাংনী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর-মিরপুর অঞ্চলের এক সময়ের ত্রাস রওশন আলী (৫৫) দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর আটক হয়েছে। সোমবার রাতে রাজশাহী শাহ মখদুম থানা এলাকা থেকে র‌্যাবের একটি দল তাকে আটক করেছে। তাকে গাংনী থানায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় পুলিশ।
জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা কুষ্টিয়ার কাজী আরেফ আহম্মেদসহ জাসের পাঁচ নেতা ও গাংনীর কাজিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পীরতলা গ্রামের আব্দুল বাকি হত্যা মামলার ফাঁসির দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি রওশন আলী। এছাড়াও ভবানিপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন মাস্টার হত্যা মামলার আসামি রওশন আলী।
রওশন আলীর উত্থান :
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভবানীপুর-পীরতলাসহ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কিছু অংশ প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিলো। এলাকায় আধিপত্য ছিলো ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (ইপিসিপি)। পরবর্তীতে ইপিসির সাথে সম্পৃক্তরা ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে ছিলো। তবে ওয়ার্কার্স পার্টিতে থাকার সময় এলাকায় তাদের সুনাম ছিলো। চোর, ডাকাতসহ সমাজের জন্য ক্ষতিকর মানুষের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান ছিলো তাদের। এরপরে ব্যক্তি গ্রুপে বিভক্ত হয় কয়েকজন। এর মধ্যে মতি মোল্লা ও কাজিপুর গ্রামের সাবেক নুরু মিলিটারি ছিলেন একসাথে। তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুবকদের টানতে থাকে। নুরু মিলিটারির সাথে যুক্ত হয় যুবক রওশন আলী।
এদিকে কাজিপুর ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা আব্দুল বাকি। তখন মেম্বার ছিলেন নুরু মিলিটারি। চেয়ারম্যান-মেম্বারের দ্বন্দ্বে এক পর্যায়ে নুরু মিলিটারি চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর জের ধরে ১৯৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে বাকি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকা-ের সময় রওশন মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলেন। নুরু মিলিটারি ছিলেন পেছনে বসে। কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের তেরাইল কলেজের পাশে মোটরসাইকেলের ওপরে বসেই বাকি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করে তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বাকির ভাই সাজ্জাদুল স্বপন বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার আসামি হিসেবে রওশন আলীকে ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফাঁসির আদেশ দেন।
এদিকে আব্দুল বাকিকে হত্যাকা-ের পর বেপরোয় হয়ে ওঠেন নুরু মিলিটারি ও রওশন আলী। বাকি হত্যাকা-ের তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ মাস্টার। বাকি হত্যাকা-ের কয়েকমাস পর প্রকাশ্য দিবালোকে ভবানীপুর-পীরতলা মাঠের সড়কে গুলি করে আমাজাদ মাস্টারকে হত্যা করে তারা। হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আমজাদ মাস্টার হত্যাকা-ের পর থেকেই এলাকায় নুরু মিলিটারি, রওশন ও তাদের লোকজন আধিপত্য বিস্তার করে। এরপরে তারা কাজী আরেফ আহম্মেদ হত্যাকা-ের মিশনে অংশ নেয়। ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি সভা চলার সময় ব্রাশ ফায়ারে জাতীয় সমাজতান্দ্রিক দল জাসদের পাঁচজন নেতা নিহত হন। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ ছাড়াও নিহত হন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরায়েল হোসেন এবং শমসের ম-ল। তবে এর কিছুদিন পরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী এলাকায় সন্ত্রাসী দলের কোন্দলে হত্যাকা-ের শিকার হন নুরু মিলিটারি।
এদিকে ওই হত্যাকা-ের পাঁচ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০ অগাস্ট রওশন আলীসহ ১০ জনের ফাঁসি এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেন কুষ্টিয়া জেলা জজ। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হলে ২০০৮ সালের ৫ আগস্ট হাইকোর্ট নয়জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন, একজনকে খালাস দেন ও ১২ জনের সাজা মওকুফ করেন।
ফাঁসির দ-প্রাপ্ত দুইজন এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে ২০১১ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেই আদেশ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর ফাঁসির দ-প্রাপ্তদের রিভিউ আবেদনও খারিজ করে দেয়া হয়। পরে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও তা নাকচ করে দেয়া হয়।
২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি রাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হয় তিন আসামির। এরা হলেন- কুষ্টিয়ার মিরপুরের রাজনগর গ্রামের হাবিবুর রহমান, কুর্শা গ্রামের আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে কারাগারে একজনের মৃত্যু হয় আর বাকিরা পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে রওশন আলী আটকের মধ্য দিয়ে আরও একজন আটক হলো।
এদিকে রওশন আলী আটকের খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে গাংনীর আব্দুল বাকি ও আমজাদ মাস্টারের পরিবারের সদস্যদের মাঝে। এই ঘাতকের দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর হবে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More