মুক্তিযুদ্ধবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান দামুড়হুদার নাটুদহ — স্বাধীনতা স্মারক : বৈদ্যনাথতলা থেকে আটকবর

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাজধানী মুজিবনগরের (তখনকার বৈদ্যনাথতলা) সীমান্তবর্তী একটি গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান নাটুদহ। ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট পাকিস্তানি শত্রুদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সম্মুখযুদ্ধ হয়- সেই অংশটুকুই আজ মুক্তিযুদ্ধের গণকবর বা আটকবর। এটি ভৌগোলিকভাবে চুয়াডাঙ্গা জেলায়। সেই সম্মুখযুদ্ধে ৮ বীর মুক্তিযোদ্ধা এখানে শহীদ হন। বেশ কিছু পাক আর্মিও মৃত্যুবরণ করেন। কালক্রমে নাটুদহের এ অংশটুকু ঐতিহাসিক মর্যাদা পায়; ‘আট কবর’ নামেই এখন ইতিহাস ও স্থানীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেছে।
চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার যেতেই নাটুদহ বাজার। আরও একটু এগিয়ে যেতেই একটা মোড়। সোজা গেছে মুজিবনগরের দিকে। ৬ কিলোমিটার দূরে আমাদের গর্বের মুজিবনগর। ডানদিকে কয়েক কদম যেতেই একটি প্রাচীরঘেরা কমপ্লেক্স। লেখা আছে আটকবর। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। গেটে লেখা আছে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ক্যাম্পাস খোলা থাকে। শুক্রবার বন্ধ থাকে।
গেটের সাথেই শানবাঁধানো সারি সারি আটটি কবর। ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট এখানে পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে ৫জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। তারা বিভিন্ন এলাকার লোক ছিলেন। নাম ফলকে লেখা আছে আট শহীদ ও তাদের ঠিকানা। সামান্য কিছু ইতিহাসও। মর্মান্তিক সেই কাহিনি। এরপর লেখা আছে শহীদদের নাম ও ঠিকানা। আটজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন-(১) হাসান জামান, গোকুলখালী, চুয়াডাঙ্গা; (২) খালেদ সাইফুদ্দিন তারেক, পোড়াদহ, কুষ্টিয়া; (৩) রওশন আলম, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা; (৪) আলাউল ইসলাম খোকন, চুয়াডাঙ্গা শহর; (৫) আবুল কাশেম, চুয়াডাঙ্গা শহর; (৬) রবিউল ইসলাম, মোমিনপুর, চুয়াডাঙ্গা; (৭) কিয়ামুদ্দিন, আলমডাঙ্গা; (৮) আফাজ উদ্দিন চন্দ্রবাস, দামুড়হুদা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট গেরিলা কমান্ডার হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী জয়পুর শেল্টার ক্যাম্পে অবস্থান নেন। এ সময় পাকিস্তান মুসলিম লীগের দালাল কুবাদ খাঁ পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ পাতে। সে জয়পুর ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীকে খবর দেয় যে, রাজাকারেরা নাটুদা, জগন্নাথপুর ও এর আশপাশের জমি থেকে পাকা ধান কেটে নেয়ে গেছে। দেশপ্রেমের টানে যুবকদের রক্ত টগবগ করে ওঠে। রাজাকার ও পাক আর্মিদের শায়েস্তা করতে ৫ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধার দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এলাকায়। এ সুযোগে নাটুদা ক্যাম্পের পাক আমির্রা পরিকল্পিতভাবে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। আটকা পড়েন বেশ কয়েকজন। আটজন মুক্তিযোদ্ধাকে তারা হত্যা করে। বেশ কয়েকজন আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অবশ্য এ সম্মুখযুদ্ধে অনেক পাক আর্মিও হতাহত হয়। পাক আর্মির নির্দেশে রাজাকারেরা ৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে পাশাপাশি দুটি গর্ত করে কবর দেয়। পরবর্তীতে এর নামকরণ হয় ‘আটকবর’।
পাশেই রয়েছে মুক্তমঞ্চ। প্রতি বছর স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, ৫ আগস্ট অনুষ্ঠান হয় এখানে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সরকারি ভিআইপিরাও আসেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। এখানে লাল-নীল-সাদা বিভিন্ন ফুল ফুটে মোহনীয় দৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে ছোট্ট এ ক্যাম্পাসে। এছাড়া বিভিন্ন ফলজ ও ফলদ গাছও রয়েছে। আমের মুকুলে ম-ম করছে। আমলকি হরতকিসহ বিভিন্ন ভেজষবৃক্ষও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছু প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ ক্যাম্পাসকে মনোমুগ্ধকর করছে।
এসবের মধ্যদিয়েই যেতে হয় মিউজিয়ামের দিকে। দ্বিতলবিশিষ্ট এ ভবন। ঢোকার আগেই বেগুনি রঙের ফুলের গাছ মুগ্ধ করবে। দুই পাশেই আরও কয়েকটি ফুল ও শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ। যেন ফুলের জলসাঘর দিয়েই মিউজিয়ামে যাচ্ছি। কেয়ারটেকার কাম আমার গাইড মজিবর দায়িত্বে আছেন। আর দর্শণার্থীদের বিভিন্ন ফুল-ফলের নাম বলে দেন। গেট খুলতেই ডানপাশে কনফারেন্স রুম পড়বে। ১০০টি চেয়ার আছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচনা এখানেও হয়। অনুমতি নিয়ে এখানেও অনুষ্ঠান করা যায়। দেয়ালের চতুর্দিকে আলোকচিত্র। যুদ্ধকালীন বিভিন্ন চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক কিছু চিত্রও আছে। বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি বিভিন্ন খেতাবপ্রাপ্ত ও বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের ছবি আছে। আছে দেশ-বিদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কিছু স্থিরচিত্র। মজিবর বললেন, এর ভেতর ২০০টি ছবি আছে। আর সিঁড়িতে আছে আরও ৮০টি ছবি। যেটা দ্বিতল পর্যন্ত গেছে।
পাশেই একটা লাইব্রেরি রয়েছে। তবে বইপত্র খুবই কম। পাশের কক্ষটি ডাইনিং রুম। সিঁড়ির নিচে সাথে টয়লেট ও ওজুখানা। দুই তলায় দিকে দুটি ব্যালকনি। এখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। কেউ গবেষণার কাজে গেলে রাত্রিযাপনও করতে পারবেন। আপাতত ফাঁকা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের জিনিসপত্র পাওয়া গেলে রুমে রাখা হবে। সাথে সাথে কয়েকটি রুম আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More