এসব অপমৃত্যুর দায় নেবে কে?

সম্পাদকীয়

অগ্নিকা-ের মতো ঘটনা কতটা ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেই চলেছে- যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি আবারও ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরের তথ্য মতে, চট্টগ্রামের সীতাকু-ে বেসরকারি একটি কন্টেইনার ডিপোতে আগুনের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৯ জন হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী রয়েছেন। তারা উদ্ধার কাজে অংশ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দগ্ধ ও আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলেও খবরে উঠে এসেছে।   নগরী চট্টগ্রাম থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কদমরসুল এলাকায় বিএম ডিপো নামের ওই কন্টেইনার টার্মিনালে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন লাগে। পরে রাসায়নিকের কন্টেইনারে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটতে থাকলে বহু দূর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সবগুলো ইউনিট চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা থেকে অগ্নি নির্বাপক গাড়ি পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। লক্ষণীয়, শনিবার রাতে আগুন লাগলেও রোববারেও সীতাকুন্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে জানা যায়। আর এ অবস্থায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতার কাজে যোগ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল।

এছাড়া আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা জানা যায়নি বলে জানান চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আশরাফ উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ঘটনা তদন্তে ৯ সদস্যের একটি কমিটি করা হবে। কমিটিকে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হবে। আমরা মনে করি, কারণ নির্ণয় করে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। বিএম ডিপোর জেনারেল ম্যানেজার বলেছেন, ২৪ একর জমিতে এই ডিপো। প্রায় ৪৩০০ কন্টেইনার ছিল। ৩০০০ হাজার খালি। ৪৫০ কন্টেইনারে আমদানি আর ৮০০-এর মতো রপ্তানি কন্টেইনার। রাসায়নিক পণ্যের কন্টেইনার আলাদা রাখা হয়। কত রাসায়নিক কন্টেইনার ছিল তা তার জানা নেই।

এর আগেও নিমতলী থেকে শুরু করে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে কেমিক্যাল সংক্রান্ত বিষয়ই সামনে এসেছে। এ নিয়ে তখন কিছুদিন হইচই হলেও শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। কেউই শিক্ষা নেয়নি। নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা আসেনি। এখানেও এরই পরিণতি লক্ষ্যণীয় হলো। সীতাকু-ের স্থানীয় সংসদ সদস্য এখন অবশ্য বলছেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে কনটেইনার ডিপোতে রাসায়নিক পদার্থ জমা করা হয়েছে তা তদন্ত করা উচিত।’ দুর্ঘটনার পর এমন বক্তব্য আগেও শোনা গেছে, এখনও একই ধরনের বক্তব্য আসছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যমের স্ক্রিন ভরে উঠছে ওই ঘটনার খবর, ছবি ও ভিডিওতে। একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, লাইভ করতে গিয়েই বিস্ফোরণে উড়ে যাচ্ছে। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এত বেশি ছিলো যে আশপাশের এলাকায় ঘরবাড়ির জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে রাখা পণ্যবাহী অনেকগুলো কনটেইনার পুড়ে যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে আসতে থাকে। অধিকাংশই মারাত্মকভাবে পোড়া রোগী। আবার অনেকের হাত পা উড়ে গেছে। রোগী আর স্বজনদের আহাজারি ও আর্তনাদে ভরে উঠছে হাসপাতাল চত্বর। নিহত মানুষের সংখ্যা ২, ৪, ১৫, ৩২, ৪০, ৪৯…লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, ডিপোতে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক, উৎসুক জনতা সবাই রয়েছেন। রাসায়নিক আছে সে রকম তথ্য আগে থেকে না পেয়েই আগুন নেভাতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন ফায়ার সার্ভিসের আট সদস্য। প্রাথমিক খবরে জানা যাচ্ছে, ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড নামে রাসায়নিক ছিলো। নিজে দাহ্য না হলে অক্সিজেন জুগিয়ে আগুনের মাত্রা বাড়াতে এটি সহায়তা করেছে। বদ্ধ কনটেইনারে থাকা হাইড্রোজেন পার অক্সাইড অন্য কোনো দাহ্য রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসায় একসময় বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে ভয়াবহ অগ্নিকা- ও মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দাহ্য রাসায়নিক কেন অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে একই ডিপোতে পাশাপাশি রাখা হবে? সেটা দেখার কর্তৃপক্ষ কে? এতো মানুষের মৃত্যু, এতো মানুষের আহত হওয়ার কিংবা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির দায় নেবে কে? নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর সীতাকু-ের এই বিপর্যয় কেন ঘটলো? তাহলে অতীতের বিপর্যয় থেকে আমরা কি কিছুই শিক্ষা নেবো না? সীতাকু-ের অগ্নিকা-ের পরও হয়তো কয়েকদিন তোড়জোড় চলবে। তারপর আমরা আবার আমাদের শামুকের খোলের মধ্যে চলে যাব। এরপর আবার কোনো বিপর্যয়ের জন্য সবাই বসে থাকবো। বাংলাদেশে আমরা দেড় দশক ধরে একমাত্রিক উন্নয়নজ্বরে আক্রান্ত। এ উন্নয়নের লক্ষ্য মুনাফা বাড়ানো, জিডিপি বাড়ানো, মাথাপিছু আয় বাড়ানো। কিন্তু উন্নয়ন মানে তো মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা, সে চিন্তা নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে ব্যক্তিপর্যায়ে কারও মধ্যে নেই। সাইক্লপস দৈত্যের মতো একমুখী উন্নয়নের এই দানব ঠেকাবে কে? উন্নয়নে যদি মানুষই বলি হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের আদৌ কি কোনো মানে দাঁড়ায়? এসব উন্নয়ন অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনার দায় অবশ্যই সরকার, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি সবাইকে নিতে হবে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা যাতে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ পান, এর নীতিমালাও তৈরি করতে হবে। তাতে অন্তত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার কিছুটা অবলম্বন পাবে। দায়ীদের অবশ্যই কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, উন্নয়নদর্শনের কেন্দ্রে মানুষকে না আনা হলে এ বিপর্যয় থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More