করোনা: করুণা প্রার্থনা করে নয় যুদ্ধ করেই করোনাকে হারাতে হবে

…………. অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী………………

করোনা কাউকেই করুণা করে না। সারা পৃথিবীর মানুষ করোনার কাছে আজ করুণা প্রার্থী, যদিও করোনার কাছে প্রার্থনা করে লাভ নেই। যুদ্ধ করেই করোনাকে হারাতে হবে। তাই, ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত দাম্ভিকতা ভুলে মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। একদিকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক একজন লড়াকু যোদ্ধা, সৈনিক। প্রশিক্ষণবিহীন মানুষ নামের যোদ্ধারা অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধে নেমেছে। সকল জাতিগত দম্ভ ভুলে, বর্ণ পরিচয় ভুলে, ছোট-বড় রাষ্ট্রীয় ভেদাভেদ ভুলে, ধর্মীয় ভেদাভেদ উপেক্ষা করে যদি মানুষের মনুষত্বের মহিমা নিয়ে আন্তরিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে গেলে এ যুদ্ধে মানুষের জয়ডংকা বাজবে। একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে অতীতের মতো মানুষেরই জয় হবে, পরাজিত হবে করোনা ভাইরাস।

পৃথিবীতে যখনই দুঃসময় এসেছে তখনই মানুষ হাতে-হাত রেখে একত্রে সচেতনভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এগিয়ে গেছে, সফলতাও পেয়েছে। করোনা প্রতিরোধে মানুষেরই জয় হবে, মানুষই উড়াবে শেষ বিজয় পতাকা। করুণা প্রার্থনা করে নয়, যুদ্ধ করেই করোনাকে হারাতে হবে।

করোনার মতো অজ্ঞাত রোগ ইতোপূর্বে ভিন্ন ভিন্ন নামে মানুষের সামনে এসেছে এবং মানব জাতির ক্ষতিও করেছে কিন্তু ধ্বংস করতে পারেনি। মানুষ ধৈর্য্য ধরে সে পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে সৃষ্টির সেরা হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় তুলে ধরেছে। শত বছর পরপর যতই মহামারি আসুক না কেন মানুষ অদৃশ্য শত্রু দমনের অস্ত্র (ঔষধ) আবিষ্কার করে তার মোকাবেলা করবে। মানুষ নব নব কৌশল আবিষ্কার করে করোনাকে ঘায়েল করবে। বারবার হাত ধুয়ে, নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে, একে অপরের সাথে কোলাকুলি ও হ্যান্ডসেক থেকে বিরত করা থেকে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, চোখ-নাক-মুখে অপরিষ্কার হাত দেয়া থেকে বিরত থেকে, দেহে করোনা ভাইরাস প্রবেশের পথ কঠিন ও কঠোরভাবে বন্ধ রেখে করোনার বৃদ্ধিই শুধু ঠেকাবে না উপযুক্ত ঔষধ আবিষ্কারের মাধ্যমে করোনাকে ঘায়েল করতে সক্ষম হবে।

মানুষের মধ্যে এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা ইতোমধ্যেই গবেষণাগারে ঢুকে করোনা বধ এর অস্ত্র আবিস্কারের গবেষণায় রত হয়েছেন। মানুষের এ-প্রচেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হবে না, হতে পারে না। মানব সৃষ্টির পর হতে যখনই মানুষের উপর আঘাত এসেছে তখনই মানুষের ঐক্যের বন্ধন অটুট হয়েছে, সুদৃঢ় হয়েছে। করোনা আক্রমনের প্রেক্ষাপটেও মানুষের ঐক্যের দৃঢ়তা দৃশ্যমান হচ্ছে এবং আগামীতে আরও হবে। একথা সত্য যে, ইতোমধ্যেই বহু মানুষ করোনার আকস্মিক ধাক্কায় মৃত্যুবরণ করেছে। একথা আরও সত্য যে, রাতের পর দিন আসে। অন্ধকার যতো ঘনিভূত হয় আলো ততোই কাছাকাছি হয়। নিরাশ না হয়ে, হতাশ না হয়ে বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে শত্রুর কৌশল জেনে সাহসিকতা সম্পন্ন যোদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।

ইতোমধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের গবেষকরা নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তা অন্যের সাথে শেয়ার করে পদক্ষেপ নিয়েছে। তাতে অদৃশ্য ঘাতক করোনার মুখোশ উন্মোচন হতে শুরু করেছে। এর ফলে অচিরেই ঘাতকের পরিপূর্ণ মুখোশ খুলে যাবে এবং মানুষের সামনে করোনার চেহারা দৃশ্যমান হয়ে পড়বে। অদৃশ্য শত্রুকে ঘায়েল করা যেমন কঠিন, তেমনি দৃশ্যমান শত্রুকে ঘায়েল করা ততটাই সহজ। করোনার মুখোশ খোলার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে । পরবর্তীতে শত্রুকে দমনের শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে করোনা আবশ্যই পিছু হটবে। এ যুদ্ধে আমরা কিছু মানুষকে হারিয়েছি, আগামীতেও হারাবো আরও কিছু। কিন্তু জয় আমাদের নিশ্চিত হবেই। কারণ মানুষ হারতে জানেনা, লড়াই করতে জানে।

যারা গবেষণাগারে কাজ করছেন, হাসপাতালে হাসপাতালে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দিচ্ছেন, তথ্য আদান প্রদানসহ বিভিন্নভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, খাদ্য, পণ্য, বাঁচবার উপকরণ সহায়তা দিয়ে মনুষত্বের পরিচয় দিচ্ছেন তারা এ-যুদ্ধে প্রথম কাতারের এক একজন সৈনিক। তাদের ত্যাগ কখনোই বৃথা যেতে পারে না। মানুষের জয় অবসম্ভাবী। শুধুমাত্র একটু সাহসিকতার সাথে, দৃঢ়তার সাথে, সু-শৃঙ্খলভাবে জয়ের কৌশলগুলি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ বুদ্ধিমান হয়ে ঠিক কাজটি করতে পারলেই করোনার পরাজয় নিশ্চিত করা যাবে।

সমাজে, রাষ্ট্রে, ধর্মে যখনই সংকট এসেছে তখনই গুজব নামক একটি ভাইরাস কিছু কিছু মানুষের মস্তিস্কে বাসা বেঁধেছে। যার মাথায় বাসা বেঁধেছে তাকে ব্যবহার করে মিথ্যুকেরা মিথ্যার পর মিথ্যার আওয়াজ তুলে সহজ সরল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজ করে  যাচ্ছে। এদের মধ্যে এমন মানুষও আছে যারা সচেতনভাবে ‘ওলোট-পলোট করে দে-মা লুটে পুটে খায়’ আদর্শের অনুসারী। এরা মানুষের আকৃতির আড়ালে অমানুষের প্রতিচ্ছবি।

সকল ধর্মের প্রবক্তাই মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। তবু কিছু লোক বিভিন্ন লেবাস ব্যবহার করে প্রতিনিয়তই মিথ্যা আউড়িয়ে মানুষের অগ্রযাত্রাতে বিঘœ সৃষ্টি করছে। এরকম একদল বিভ্রান্ত মানুষ নিজেদের অজান্তে মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। এ যুদ্ধেও মানুষ আকৃতির জীব সম্পর্কে এ যুদ্ধকালীন সময়ে সতর্ক থাকতে হবে। যারা মানুষের দূর্যোগকালে অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মানুষের কল্যাণে পাঁশে না দাঁড়িয়ে সু-কৌশলে মানুষের জন্য সাহায্যসামগ্রী আত্মসাৎ করছে তারাও মানুষের একটি বিশেষ গোত্রের ঘৃণ্য প্রাণী (ধর্মীয় লেবাস যাই থাকুক না কেন!)। এদের সম্পর্কে সজাগ থাকা খুবই জরুরি। কেননা এরা সু-সংগঠিত রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে ক্ষমতাধর এবং মানব কল্যাণ বিদ্বেষী।

মানুষের সাথে করোনার যুদ্ধকালীন চলমান সময়ে তাই শুধু করোনা সম্পর্কে সতর্ক হলেই হবে না; মানুষের ছদ্মবেশে যারা অমানুষের ভূমিকা পালন করছে তাদের সম্পর্কেও শ্যেনদৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদেরকে কঠোরভাবে আইনের চাঁদরে জড়িয়ে ফেলতে হবে।

মনে রাখতে হবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তারা যেমন মানুষ নয়, তেমনই মানুষের কল্যাণে আগত সাহায্যসামগ্রী যারা আত্মসাৎ করছে তারাও অমানুষ। এদেরকে কিছু মনুষ্যত্বের মহিমা দেখালে সমগ্র মানবকুলের বড় একটা ক্ষতি হয়ে যাবে।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More