আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

করোনার কারণে স্বল্প পরিসরে অনুষ্ঠানের আয়োজন

শেখ সফি: আজ শনিবার ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙ্গালী জাতির এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল¬ার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো। ২১৪ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পলাশীর আম্রকানের অদূরে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হয়। মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে আজ মুজিবগনগর আম্রকানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জনসভা হবে না। তবে মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্ষিপ্তভাবে অনুষ্ঠান পালন হিসেবে স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারত গমনের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল রনাঙ্গণের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনা করেন। ওই আলোচনার মাধ্যমে এ এলাকার নিরাপত্তা ও ভৌগলিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হন এবং ১৪ এপ্রিল শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। প্রথম দিকে চুয়াডাঙ্গাতে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ায় কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শপথ গ্রহণের স্থান চুয়াডাঙ্গার পরিবর্তে ইপিআর-উইং-এর অধীন মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা বৈদ্যনাথতলা নির্ধারণ করা হয়।
দিনের পর দিন মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ যুদ্ধের করে স্বীকৃতি না পেয়ে মুক্তিকামী মানুষের মনোবল যখন ভাঙতে শুরু করে ঠিক এমনই এক সঙ্কটকালীন সময়ে ভারতীয় বিএসএফ’র উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার ও ৭৬ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল চক্রবর্তী বৈদ্যনাথতলায় এসে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি এবং তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহীসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমানে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ) জায়গা দেখিয়ে মঞ্চ তৈরীর প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলেন। আপামর জনতা স্বতঃস্ফুর্ত অংশ গ্রহণের মাধ্যমে ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে শুরু করে সারারাত ধরে মঞ্চ তৈরী, বাঁশের বাতা দিয়ে বেস্টনি নির্মাণ এবং স্থানীয়ভাবে ভাঙা চেয়ার-টেবিল দিয়েই আয়োজন সম্পন্ন করেন। আনুসঙ্গিক সরঞ্জাম আসে ভারতের হৃদয়পুর বিএসএফ ক্যাম্প থেকে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সেই মাহিন্দ্রক্ষণে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সকাল ৯টার দিকে বৈদ্যনাথতলায় পৌঁছান। ইতোমধ্যে দেশী-বিদেশী শতাধিক সাংবাদিক এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও আসেন। বহু প্রতিক্ষিত শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ১১টায়।
মেজর আবু উসমান চৌধুরীর পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় ক্যাপ্টেন মাহবুবউদ্দীন আহমেদ ইপিআর ও আনসারের একটি ছোটদল নিয়ে নেতৃবৃন্দকে অভিবাদন জানান। অভিবাদন গ্রহণের পর স্থানীয় শিল্পীদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পার্শ্ববর্তী গৌরিনগর গ্রামের বাকের আলীর (প্রভাষক, মুজিবনগর ডিগ্রি কলেজ) কোরআন তেলওয়াত এবং ভবরপাড়া গ্রামের মি. পিন্টু বিশ্বাসের বাইবেল পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এরপর আওয়ামী লীগের চিফহুইফ অধ্যাপক মো. ইউসুফ আলী বাংলার মুক্ত মাটিতে স্বাধীনতাকামী কয়েক হাজার জনতা এবং শতাধিক দেশী বিদেশী সাংবাদিকের সামনে দাঁড়িয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঐতিহাসিক সেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে চিফ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলী রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শপথবাক্য পাঠ করান। এরপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমেদের নাম ঘোষণা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শক্রমে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য আইন, সংসদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খন্দকার মোশতাক আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এএইচএম কামরুজ্জামান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে পরিচয় করিয়ে দেন। এ অনুষ্ঠানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত না থাকলেও বারবার উচ্চাররিত হয় তার নাম।
মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্ণেল এমএজি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ পদে কর্ণেল আব্দুর রবের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ উপস্থিত সকলের সামনে ৩০ মিনিটের এক উদ্দীপনাময় ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, আজ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হবে এ বৈদ্যনাথতলা এবং এর নতুন নাম হবে মুজিবনগর। তিনি ওই ভাষনে বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিদান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান।
বক্তৃতা এবং শপথগ্রহণ পর্ব শেষে নেতৃবৃন্দ মঞ্চ থেকে নেমে এলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মেজর আবু উসমান চৌধুরী। উপস্থিত জনতার মূহুমূহু জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মুজিবনগরের আম্রকানন। সব মিলিয়ে ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়। এ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই টানা ৯ মাস যুদ্ধ শেষে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম নামের বাংলাদেশ।
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরের সেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যে পথে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারতীয় নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে আসেন। স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে গত ২৬ মার্চ ২০২১ সেই সড়ককে ‘স্বাধীনতা সড়ক’ নামকরণ করে উদ্বোধন করা হয়েছে।
মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে আজ মুজিবগনগর আম্রকাননে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে না জনসভা। তবে মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্ষিপ্তভাবে অনুষ্ঠান পালন হিসেবে স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ইতোমধ্যে গণপূর্ত বিভাগ মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ধোঁয়ামোছা, মুজিবনগর আমবাগান পরিস্কার করাসহ পাশর্^বর্তী এলাকায় রংয়ের কাজ শেষ করেছে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক জানিয়েছে দিনটি উপলক্ষে এবার সকাল ৬ টায় মুজিবনগর পুলিশের আয়োজনে স্মৃতিসৌধ এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনি দেয়া হবে। এরপরই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রালয়ের পক্ষে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণক রবেন মেহেরপুর জেলা প্রশাসক মুনসুর আলম খাঁন। পরে বাংলাদেশ আ.লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন জাতীয় সংসদের হুইপ জয়পুরহাট-১ আসনের এমপি আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। এরপর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। পরে সন্ধ্যায় মুজিবনগরে বর্ণিল আঁতশবাজির আয়োজন করা হয়েছে।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More